shofiq.com

বাবার হাতে শীতের প্রস্তুতি: খেজুর রসের মিষ্টি স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্য

শীতকাল! প্রকৃতির এক নীরব প্রস্তুতি, আর আমাদের বাড়িতে শীতের আগমন ঘটত আমর জান্নাতবাসী আব্বার হাতের নিপুণ স্পর্শে। অন্য কারও কথা জানি না, কিন্তু আমার বাবা প্রতি বছর বর্ষা শেষের পরপরই শুরু করে দিতেন এই শীতের আয়োজন, যা ছিল আমাদের গ্রামীণ জীবনে এক উৎসবের সূচনা। আমার কাছে শীতের প্রস্তুতি মানেই ছিল আব্বার কর্মব্যস্ততা এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত ছবি।

বাঁশবাগান থেকে বাবার প্রথম পদক্ষেপ: ঐতিহ্যের সূচনা

আমাদের ২৩ শতকের বাঁশবাগানে (যেখানেেআছে জাঁওয়া এবং ভালকো বাঁশ) বাবার প্রথম পদক্ষেপ শুরু হত সেখান থেকেই। বর্ষার রেশ কাটতে না কাটতেই বাবা জাওয়া বাঁশ ঝাড় থেকে বেছে নিতেন পাকা ও পোক্ত কয়েকটি বাঁশ। সেগুলোকে নির্দিষ্ট মাপে কেটে ডুবিয়ে রাখা হত পুকুরের পনিতে—যেন প্রতিটি বাঁশ কাজের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট দিন শেষে আব্বা যখন বুঝতেন এটা কাজ করার উপযোগী হয়ে উঠেছে, তখন সেই বাঁশগুলো পানি থেকে উঠত, আর শুরু হতো বাবার বিশেষ শিল্পকর্ম।

বাবা তাঁর দক্ষ হাতে তৈরি করতেন ‘গাছ কাটা দাও’-এর জন্য বিশেষ ধরনের লম্বা এবং চিকন টাইপের এক ধরনে ঝুড়ি, যাকে বলা হতো ‘ঠোঙা’। এই ঠোঙার ভেতরে সযত্নে রাখা হতো বড়, ধারালো দাও—যা দিয়ে খেজুর গাছ চেঁছে রস সংগ্রহের পথ তৈরি করা হতো। এই প্রক্রিয়া ছিল বহু পুরোনো এক গ্রামীণ লোকশিল্প, যা বাবার হাতে প্রতি বছর প্রাণ ফিরে পেত।

প্রকৃতির প্রতি বাবার সরল বিশ্বাস: গাছের যত্ন

আর কাঁঠাল গাছ? বাবার অদ্ভুত একটি বিশ্বাস ছিল—বি-চুলি বা পল (ধান গাছ) দিয়ে মুড়িয়ে দিলে কাঁঠাল গাছের শীত লাগে না, আর শীত না লাগলে গাছে ফলন ভালো হয়! এই সরল বিশ্বাসে লুকিয়ে ছিল প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর মমতা ও শ্রদ্ধা। তাই তিনি প্রতি বছর শীত আসার আগে বি-চুলি বা পল, কলার শুকনা পাতা এবং নোনা গাছের ডাল দিয়ে কাঁঠাল গাছকে মুড়িয়ে দিতেন।

এরপর আসত মাটির ভাঁড়ের পালা। নাভারণের বিখ্যাত বাজার থেকে বাবা নিজের চোখে দেখে, যাচাই বাছাই করে মাটির ভাঁড় (খেজুরের রস সংগ্রহের পাত্র) কিনে আনতেন। মাঝে মাঝে আমারও সৌভাগ্য হত আব্বার সাথে নাভারণ বাজারে যাওয়ার। আর আব্বার সাথে যাওয়া মানে নাভারণ বাজারের বিখ্যাত দোকানে রসগোল্লা খাওয়ার সৌভাগ্য। আব্বা খুব রসগোল্লা পছন্দ করতেন। এমনকি এক বসাতে ৭/৮ টি রসগোল্লা খেয়ে ফেলতে পারতেন।

বাবা নিজের হাতে পাট দিয়ে চিকন রশি তৈরি করতেন, আমরা ভাই বোনেরা তার এই কাজে সহায়তা করতাম। সবচেয়ে বেশী সহয়তা পেতেন আমার বড় বোনের নিকট থেকে। সেই রশিকে আবার পাকিয়ে তৈরি করতেন মজবুত গাছি রশি। সেই রশি কোমরে জড়িয়ে তিনি বীরদর্পে খেজুর গাছে উঠতেন গাছ কাটার জন্য। খেজুর গাছের মাথায় বাবার এই সাহস আর কর্মতৎপরতা আজও যেন হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

খেজুর রসের মিষ্টি রাত: প্রথম স্বাদের স্মৃতি

আমাদের ছিল প্রায় ৪২টি খেজুর গাছ, আর বাবা সপ্তাহে দু’দিন সেই গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন। যেদিন গাছ কাটা হতো, সেদিন রাতে এশার নামাজের পর বাবা আমাকে নিয়ে যেতেন খেজুরের রস সংগ্রহ করতে। চারিদিকে হলুদ সরষে ক্ষেত, আর শীতের হাওয়ায় দোল খাওয়া সরষের ফুলের ঘ্রান জোসনা রাতে যেন হৃদয়ে কাপন তুলত। মাঝে মাঝে শিয়ালের হাক হু হু করে উঠতো বুকের মধ্যে, কখনও সখনও শিয়াল যদি নিকটবর্তী হত তখন ভয়ে আমি আব্বাকে ডাক দিতাম আর আব্বা তরতর করে খেজুর গাছ থেকে নেমে এসে কার্তিকের ঢেলা ছুড়ে শিয়াল তাড়াতেন।

সেই দিন আর রাত গুলো কত মমতায় ভরা ছিল, সেই রাতের প্রথম রস! আহ, কী মিষ্টি তার স্বাদ! সেই স্বাদ আজও পৃথিবীতে অতুলনীয়। আব্বা ভাঁড়ের বাঁকের এপাশে আটটা আর ওপাশে আটটা ভাঁড় ঝুলিয়ে আবার কখনও কখনও আমাকে কাঁধে নিয়ে খেজুর গাছ কাটার জন্য রওনা দিতেন। পতিমধ্যে যদি কখনও আমার প্রতিবেশী এক দাদার সাথে দেখা হত তখন তিনি আমার বাবাকে বকাবকি করতেন আমাকে কাঁধে নেওয়ার কারনে। বলতেন-’ এতো আদিক্ষেতা কিসের, বড় হয়ে দেখবে ভাতও দিবে না’। আমার বাবা কোন উত্তর না করে শুধুই স্নীগ্ধ হাসি হাসতেন। কত নির্মল কত সহজ সরল ছিল সে হাসি।

সেই রাতেই মা রস জ্বাল দিয়ে কিছুটা পাকিয়ে রেখে দিতেন পরের দিন সকালে জাউ রান্নার জন্য। কখনও কখনও রাতেই রান্না হয়ে যেত জাউ। সকালে মা সেই রস দিয়ে রান্না করতেন এক প্রকারের পায়স, যাকে বলা হতো ‘জাউ রান্না’। সেই সুস্বাদু ও সুঘ্রাণযুক্ত খাবারটির স্বাদ এখনও যেন জিভে লেগে আছে। পরের দিনের সকালের রস দিয়ে তৈরি হতো খাঁটি গুড় এবং পাটালী, যা দিয়ে আমাদের সারা বছর চলত।

গুড় জ্বালানোর স্বর্গীয় ঘ্রাণ ও উৎসব

গুড় জ্বালানোর সময় সারা বাড়ি মৌ মৌ করত এক স্বর্গীয় সুঘ্রানে ও আবেশে। দুপুরের পর যখন গুড় জ্বালানো শেষ হতো, তখন এক মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ত। পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা কাঁঠাল পাতা ধুয়ে হাতে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। আর আমার মমতাময়ী মা সেই পাতার বাটিতে সদ্য তৈরি নলেন গুড়/নতুন গুড় ঢেলে দিতেন। তারা সেই গুড়ের স্বাদ উপভোগ করতে করতে হাসিমুখে বাড়ির দিকে রওনা হতো। সেই শীতের পিঠা-পুলি আর গুড়ের দিনগুলো ছিল এক অপার আনন্দ আর ভালোবাসার বন্ধন।

সময়ের নীরবতা ও গভীর হাহাকার

আজ সেই দিনগুলো কেবলই ধূসর স্মৃতি। আমার প্রিয় বাবা নেই, তিনি আজ জান্নাতবাসী। আমাদের সেই ঐতিহ্যের খেজুর গাছগুলোও আর নেই। গুড় জ্বালানোর সুঘ্রাণে পাড়ার ছেলেমেয়েরা ভিড় করে না কাঁঠাল পাতা হাতে। সময় বদলে গেছে, হারিয়ে গেছে অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য। কিন্তু প্রতি বছর শীত আসার আগে বাবার সেই নিখুঁত শীত প্রস্তুতির স্মৃতি হৃদয়ে গভীর এক হাহাকার সৃষ্টি করে—বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। এই গল্প শুধু খেজুর রস বা গুড়ের নয়, এ হলো বাবার নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং এক হারিয়ে যাওয়া নিখাদ গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি।

বিঃ দ্রঃ ছবিটি প্রতিকী

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

এই প্রকাশনাটির সর্বস্বত্ত লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। এই প্রকাশনার আংশিক বা সম্পুণাংশ অন্য যেকোন মিডিয়াতে লেখকের নামে ছাড়া অন্য কারও নামে প্রকাশ করা কপিরাইট আইন এ দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমুহ

    Recent Comments