জীবন যখন জায়নামাজ

জীবন যখন জায়নামাজ

অস্তিত্বের গূঢ় রহস্য আর মহাজাগতিক বিধানের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হলো মানবজীবন। সৃষ্টির অনাদি কাল থেকে মানুষ তার বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। পবিত্র কুরআনের অমিয় বাণী— “وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ” (আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি)—আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্যকে একটি ধ্রুব সত্যের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে ‘ইবাদত’ শব্দটিকে কেবল নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় আচারের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আটকে রাখা ইসলামী দর্শনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়। বরং এটি এমন এক জীবনবোধ, যা মসজিদের মেহরাব থেকে শুরু করে বাজারের ব্যস্ততা কিংবা অফিসের কর্মব্যস্ত ডেস্ক—সবকিছুকেই এক সুতোয় গেঁথে দেয়। যখন একজন মানুষ তার প্রতিটি কর্মকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উৎস হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তার পেশাগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতে পরিণত হয়। এই আধুনিক যুগে কর্ম ও আধ্যাত্মিকতার এই মেলবন্ধনই হতে পারে নৈতিক সংকটের পরম সমাধান।

প্রচলিত বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থা মানুষের জীবনকে দুটি ভাগে ভাগ করে ফেলেছে—একদিকে আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় জীবন, অন্যদিকে জাগতিক বা পেশাদার জীবন। কিন্তু ইসলামে এই বিভাজন নেই। আহলুল বাইয়েতের অন্যতম ইমাম, ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.)-এর মতে, পরিবারের উপার্জনের জন্য কষ্ট করা জিহাদের সমান। অর্থাৎ, কাজ করা কেবল টাকা কামানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি নিজের অলসতা ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে এক প্রকার সংগ্রাম। যখন কর্মক্ষেত্রকে ‘জিহাদের ময়দান’ হিসেবে দেখা হয়, তখন অলসতা বা কাজে ফাঁকি দেওয়া কেবল পেশাগত ত্রুটি নয়, বরং আধ্যাত্মিক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই দর্শনের গভীরে এক শক্তিশালী রূপক লুকিয়ে আছে। মসজিদের জায়নামাজ এবং কর্মস্থলের ডেস্ক—উভয়ই মুমিনের জন্য সিজদাহর জায়গা। জায়নামাজ হলো শারীরিক সিজদাহর স্থান, আর কর্মস্থলের ডেস্ক হলো ‘চারিত্রিক সিজদাহর’ জায়গা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ

(অর্থ: অতঃপর সালাত শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তথা রিজিক সন্ধান করো। — সূরা আল-জুমুআঃ ১০)

নামাজের ঠিক পরেই জমিনে ছড়িয়ে পড়ার এই নির্দেশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বোঝায় যে, নামাজে আমরা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যে আধ্যাত্মিক শক্তি পাই, কর্মক্ষেত্রে সেই শক্তি দিয়ে আমাদের সততার পরিচয় দিতে হবে।

ইসলামের মূল নির্যাস হলো ‘ইহসান’ বা আল্লাহকে সর্বদা উপস্থিত মনে করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহসানের ব্যাখ্যায় বলেছেন:

أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ

(অর্থ: তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে জেনে রেখো তিনি তোমাকে দেখছেন। — সহিহ বুখারি)

আজকের করপোরেট সংস্কৃতিতে দক্ষতা থাকলেও সততার বড় অভাব। সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে বাহ্যিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা গেলেও অন্তরের স্বচ্ছতা আনা সম্ভব নয়। কিন্তু ‘ইহসান’ বা ‘স্রষ্টা আমাকে দেখছেন’—এই চেতনা থাকলে একজন কর্মী কখনোই কাজে ফাঁকি দিতে বা দুর্নীতি করতে পারেন না। কারণ ইসলামে হালাল উপার্জনও একটি ফরজ কাজ:

طَلَبُ كَسْبِ الْحَلالِ فَرِيضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ

(অর্থ: হালাল জীবিকা অন্বেষণ করা অন্যান্য ফরজ ইবাদতের পর একটি ফরজ। — বায়হাকি)

যদি আমরা কর্মক্ষেত্রকে মসজিদের মতো পবিত্র মনে করি, তবে সমাজের সংকটগুলো নিমোক্ত উপায়ে সমাধান হবেঃ

  • সময় ও শৃঙ্খলাঃ মসজিদে জামাতে নামাজ পড়তে যেমন সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম, কর্মক্ষেত্রেও সময়ানুবর্তিতা তখন একটি ধর্মীয় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াবে।

  • দুর্নীতি ও খোদাভীতিঃ মসজিদের ভেতরে মানুষ যেমন পাপ করতে লজ্জিত হয়, তেমনি কর্মস্থলে ‘ইহসান’ থাকলে ঘুষ ও অস্বচ্ছতা বন্ধ হয়ে যাবে।

  • পারস্পরিক শ্রদ্ধাঃ সৃষ্টির সেবা করাই হবে তখন মূল লক্ষ্য। সহকর্মী ও সেবাগ্রহীতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন তখন কেবল ভদ্রতা নয়, বরং ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।

পরিশেষে বলা যায়, কর্মক্ষেত্রকে ‘দ্বিতীয় মসজিদ  বা জায়নামাজ’ মনে করার দর্শনটি কেবল একটি আবেগীয় শব্দ নয়, বরং এটি একটি বৈপ্লবিক ও পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। এই চেতনা আমাদের শেখায় যে, মুমিনের জীবন দ্বিখণ্ডিত নয়—যেখানে এক অংশ মসজিদের জন্য আর অন্য অংশ জগতের জন্য। প্রকৃত ধর্মপ্রাণতা কেবল তসবিহ বা জায়নামাজে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তার প্রতিফলন ঘটে মানুষের কর্মের সততায়, নিবন্ধিত স্বচ্ছতায় এবং শ্রমের পবিত্রতায়।

মসজিদের মেহরাবে দাঁড়িয়ে আমরা যে খোদাভীতি বা ‘তাকওয়া’ অর্জন করি, অফিসের ফাইলে সই করার সময় কিংবা সাধারণ মানুষের সাথে লেনদেনের সময়ও সেই একই খোদাভীতি বজায় রাখাই হলো প্রকৃত সার্থকতা। যদি কোনো সমাজ তার কর্মস্থলকে ইবাদতের পবিত্রতায় সাজাতে পারে, তবে সেখানে শোষণের বদলে সেবা আর ফাঁকিবাজির বদলে নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠিত হবে। এটিই আধুনিক যুগের নৈতিক অবক্ষয় ও করপোরেট দুর্নীতির একমাত্র স্থায়ী সমাধান।

জীবন যখন এভাবে কর্ম আর উপাসনার এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধনে রূপ নেয়, তখন জাগতিক প্রতিটি কাজই পরকালীন সাফল্যের পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, কর্মস্থল কেবল জীবিকা অর্জনের যন্ত্র নয়, বরং এটি স্রষ্টার সন্তুষ্টির এক বিশাল প্রাঙ্গণ। মেহরাবের সেই আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা যখন আমাদের কর্ম ডেস্কে সঞ্চারিত হবে, তখনই সমাজ পাবে এক দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক এবং সমৃদ্ধ আগামীর নিশ্চয়তা। মানুষের নিঃস্বার্থ সেবার মধ্য দিয়ে মহান স্রষ্টার পরম সন্তুষ্টি অর্জনই হোক আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের মূল প্রেরণা।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.