অস্তিত্বের ছায়া আয়না

অস্তিত্বের ছায়া আয়না।। প্রথম পর্ব

শহরের শেষ বাতিটা যখন নিভে যায়, তখন আমার ঘরে এক অদ্ভুত নোনা গন্ধের রাত নামে। এ সেই রাত নয় যা আমরা ক্যালেন্ডারে দেখি; এ হলো ‘রাতের আড়ালে আরেক রাত’। এই রাতটি ঘরের আসবাবপত্রের ওপর ধুলোর মতো জমে থাকে, নিঃশব্দে শ্বাস নেয়, কিন্তু কোনো শব্দ শোনা যায় না।

সেদিন মাঝরাতে আমি দেখলাম, ঘরের দেয়ালগুলো হঠাৎ করে স্বচ্ছ কাঁচের মতো হয়ে গেছে। সেই কাঁচের ওপারে কে যেন দাঁড়িয়ে!

সেই আগন্তুকঃ আমারই এক টুকরো ধ্বংসাবশেষ

আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম, আমারই শরীরের ছায়াটা দেয়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মেঝের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে কোনো শব্দ নেই, যেন সে বাতাসের গায়ে ভর করে পা রেখে চলছে। যখন সে আমার মুখোমুখি হলো, আমি শিউরে উঠলাম।

  • আকৃতিঃ অবিকল আমারই মতো তার গড়ন, কিন্তু সে তৈরি হয়েছে জমাটবদ্ধ অন্ধকার আর হাজার বছরের নীরবতা দিয়ে।

  • চোখঃ তার চোখ দুটো ঠিক মানুষের চোখের মতো নয়; সেখানে জ্বলছে দু’টো জ্বলন্ত অঙ্গার। কিন্তু সেই আলোতে উত্তাপ নেই, আছে শুধু এক হিমশীতল কৌতূহল—একরাশ প্রশ্নের ছায়া

সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে আমি দেখতে পেলাম আমার ফেলে আসা সেই বিকেলগুলো, যখন আমি নিজেকে একটু একটু করে ব্যয় করেছিলাম অন্যদের খুশি করতে গিয়ে। আমি দেখলাম আমার হারিয়ে যাওয়া সেই অংশগুলো, যা আমি লোকচক্ষুর আড়ালে কোনো এক অন্ধকারে বিসর্জন দিয়ে এসেছিলাম।

যখন প্রশ্নই উত্তর হয়ে দাঁড়ায়

আমি হাত বাড়ালাম তাকে স্পর্শ করতে। আমার আঙুল যখন তার চিবুক ছুঁলো, মনে হলো আমি কোনো বরফশীতল আয়নায় হাত রাখছি। সে কথা বলল না, কিন্তু তার চোখের সেই নীলচে অগ্নিশিখা আমায় জিজ্ঞেস করল— “তুমি যাকে দিনভর আগলে রাখো, সে কি তুমি? নাকি তুমিই সেই, যাকে তুমি রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে রেখেছ?”

আমার দেখা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। আমি বুঝলাম, এটি কোনো প্রেতাত্মা নয়, কোনো অলৌকিক বিভ্রমও নয়। এটি হলো সেই হারানো অংশ, যা বহু ভাঙনের পর আমি নিজের থেকে আলাদা করে ফেলেছিলাম।

আয়না যেমন সত্যকে নগ্ন করে দেয়, আমার এই ছায়া-অস্তিত্বও তেমনই আমার সামনে এক নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। সে আমারই এক টুকরো, যা হয়তো অনেক আগেই মরে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমার অতৃপ্ত বাসনা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

বিষণ্ণ প্রশান্তির ভোর

বাইরে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। রোদের সেই কাঁচা সোনা রং যখন জানালার গ্রিল গলে ঘরে ঢুকল, আমার সেই ছায়া-অস্তিত্ব ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। সে মিলিয়ে যাওয়ার আগে তার চোখের সেই জ্বলজ্বলে প্রশ্নের ছায়াটি আমার বুকের বাঁ দিকে রেখে গেল।

আমি জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। রাত চলে গেছে, কিন্তু সেই ‘আরেক রাত‘ আমার ভিতরে স্থায়ী বসতি গেড়েছে। এখন আর আমার আয়না লাগে না। আমি জানি, অন্ধকার হলেই আমার সেই হারিয়ে যাওয়া অংশটি আবার ফিরে আসবে—আমাকে মনে করিয়ে দিতে যে, আমি আসলে একাই নই, আমার সাথে আমার সহস্র ভাঙনের স্মৃতিরা পাহারা দেয়।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.