ইসলামি আধ্যাত্মিকতা ও ইলম-এর ইতিহাসে হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর স্থান সূর্যের ন্যায় সমুজ্জ্বল। রাসূলে খোদা (সা.) বলেছেন, “আমি জ্ঞানের শহর আর আলী তার দরজা।” মাওলা আলীর একটি সুগভীর উক্তি যা প্রায়শই আধ্যাত্মিক মহলে আলোচিত হয়, তা হলো— “আমি এমন কিছু দেখি না যার আগে, পরে ও সাথে আল্লাহ নেই।” এটি কোনো সাধারণ আবেগীয় কথা নয়, বরং এটি ইলমে মারেফাত এবং কুরআন নির্দেশিত তাওহীদের একটি নির্যাস।
তাওহীদের প্রকৃত অর্থ ও ভ্রান্তি নিরসন
সাধারণত মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সৃষ্টির ‘সাথে’ আল্লাহকে দেখার অর্থ কি সৃষ্টির ভেতরে আল্লাহর মিশে যাওয়া? ইসলামি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘হুলুল’ বা ‘ইত্তিহাদ’ (একীভূত হওয়া), যা স্পষ্ট কুফর বা শিরক।
তবে আহলুল বাইতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উক্তির ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হযরত আলী (আ.) এখানে আল্লাহর ‘কাইয়্যুমিয়্যাহ’ (অস্তিত্ব দানকারী সত্তা) গুণের কথা বলছেন। যেমন পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَ لِلّٰهِ الۡمَشۡرِقُ وَ الۡمَغۡرِبُ ٭ فَاَیۡنَمَا تُوَلُّوۡا فَثَمَّ وَجۡهُ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۱۱۵﴾
“তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও না কেন, সেদিকেই আল্লাহর সত্তা বিদ্যমান।” (সূরা বাকারা: ১১৫)।
আলী (আ.)-এর দৃষ্টিতে জগত হলো একটি আয়না, আর আল্লাহ হলেন সেই সত্তা যার প্রতিচ্ছবি এই আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে। আয়নায় প্রতিচ্ছবি দেখা মানে আয়নাটি নিজেই আল্লাহ হয়ে যাওয়া নয়।
আগে, পরে ও সাথে: একটি দার্শনিক বিশ্লেষণ
এই উক্তিটিকে তিনটি কালখণ্ডে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:
১. বস্তুর আগে (Before): কোনো বস্তু অস্তিত্বে আসার আগে তা আল্লাহর জ্ঞানের (ইলম) মধ্যে ছিল। শূন্য থেকে কোনো কিছু সৃষ্টি হওয়ার অর্থ হলো তার অস্তিত্বের পূর্বে আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনা কার্যকর থাকা। অর্থাৎ স্রষ্টা সৃষ্টির মুখাপেক্ষী নন, বরং সৃষ্টিই তার অস্তিত্বের জন্য স্রষ্টার কাছে ঋণী।
২. বস্তুর পরে (After): জগত নশ্বর। যখন কিছুই থাকবে না, তখনও আল্লাহ থাকবেন। আল-কুরআনের ভাষায়,
وَ لَا تَدۡعُ مَعَ اللّٰهِ اِلٰـهًا اٰخَرَ ۘ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۟ كُلُّ شَیۡءٍ هَالِكٌ اِلَّا وَجۡهَهٗ ؕ لَهُ الۡحُكۡمُ وَ اِلَیۡهِ تُرۡجَعُوۡنَ ﴿۸۸﴾
“আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহকে ডেকো না, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তাঁর চেহারা (সত্ত্বা) ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল, সিদ্ধান্ত তাঁরই এবং তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।” (সূরা কাসাস: ৮৮)।
বস্তুর বিনাশের পরও আল্লাহর চিরস্থায়ী সত্তা বিদ্যমান থাকাকেই তিনি ‘পরে’ শব্দ দিয়ে বুঝিয়েছেন।
৩. বস্তুর সাথে (With): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ সৃষ্টির সাথে আছেন ‘রক্ষণাবেক্ষণকারী’ (মুহাইমিন) হিসেবে। একটি বৈদ্যুতিক বাতি ততক্ষণই জ্বলে যতক্ষণ বিদ্যুৎ প্রবাহ থাকে। বিদ্যুৎ চলে গেলে বাতিটির আলোর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। তেমনি মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণু প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর কুদরতের মাধ্যমে টিকে আছে। এই নিরবচ্ছিন্ন সংযোগকেই তিনি ‘সাথে’ থাকা বলে অভিহিত করেছেন।
শিরক নাকি তাওহীদের পরাকাষ্ঠা?
শিরক হলো আল্লাহর ক্ষমতায় বা সত্তায় অন্য কাউকে ভাগীদার করা। কিন্তু আলী (আ.)-এর এই উক্তিটি জগতকে এককভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল প্রমাণ করে। তিনি জগৎকে এমনভাবে দেখেছেন যেখানে আল্লাহর নূর ছাড়া অন্য কিছুর স্বতন্ত্র কোনো ক্ষমতা নেই।
নাহজুল বালাগার খুতবায় তিনি বলেছেন, “তিনি (আল্লাহ) সবকিছুর সাথে আছেন তবে দৈহিকভাবে নয়, এবং তিনি সবকিছু থেকে আলাদা তবে দূরত্ব বজায় রেখে নয়।“ এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানই হলো আহলুল বাইতের তাওহীদ। অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দূরবর্তী সত্তা নন, আবার তিনি সৃষ্টির সাথে একীভূত হয়ে সীমাবদ্ধও নন।
আধ্যাত্মিক প্রভাব
একজন মুমিনের জীবনে এই দর্শনের প্রভাব অপরিসীম। যখন কেউ বিশ্বাস করে যে প্রতিটি বস্তুর সাথে আল্লাহ আছেন, তখন তার মধ্যে:
-
তাকওয়া বা খোদাভীতি সৃষ্টি হয় (কারণ আল্লাহ সবসময় তাকে দেখছেন)।
-
মহাবিশ্বের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় (কারণ তিনি প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার কারুকার্য দেখেন)।
-
অহংকার বিলুপ্ত হয় (কারণ তিনি বোঝেন তার নিজের কোনো স্বতন্ত্র ক্ষমতা নেই)।
হযরত আলী (আ.)-এর এই উক্তিটি শিরকের বিপরীতে বরং শিরকের মূলে কুঠারাঘাত করে। এটি প্রমাণ করে যে, দৃশ্যমান এই জগত স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং এটি এক মহাশক্তির মুখাপেক্ষী। মাওলা আলীর এই দিব্যদৃষ্টি আমাদের শেখায় যে, চোখ দিয়ে শুধু বস্তু দেখলে হবে না, বরং অন্তরের চোখ দিয়ে সেই বস্তুর স্রষ্টাকে উপলব্ধি করতে হবে। এটিই হলো প্রকৃত ‘মারেফাত’ বা আল্লাহকে চেনার সঠিক পথ।





মতামত দিন-