মিরাজ

নূরানী সফর-রাসুল সাঃ এর মিরাজ সশরীরে হয়েছিল স্বপ্নে নয়

এক অলৌকিক মিলনের ইশতেহার

সলামী সাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসে ‘মিরাজ‘ কেবল একটি ঐতিহাসিক পরিভ্রমণ নয়, বরং এটি খোদাপ্রেমের এক শাশ্বত উপাখ্যান। যখন সৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে স্রষ্টা তাঁর প্রিয়তম সৃষ্টিকে একান্ত সান্নিধ্যে ডেকে নেন, তখন জন্ম নেয় এক অবিনশ্বর অলৌকিকতা। মিরাজ হলো সেই মুহূর্ত, যখন ‘ইনসানে কামিল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানব হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা.) মর্ত্যের ধূলিকণা থেকে আরশের আজিম পর্যন্ত এক জ্যোতির্ময় সেতুবন্ধন তৈরি করেন। কিছু যুক্তিবাদী বা সংশয়বাদী এই ভ্রমণকে কেবল স্বপ্ন বা রূহানি বিচরণ বলে লঘু করতে চাইলেও, প্রসিদ্ধ উলামায়ে কেরাম অকাট্য দালিলিক ভিত্তি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, মিরাজ ছিল সশরীরে এবং জাগ্রত অবস্থার এক অনন্য মুজিজা। এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলো—মিরাজ কেবল আত্মার বিচরণ নয়, স্বপ্নে নয় বরং রূহ ও জাসাদ (দেহ)-এর একীভূত সফরের মাধ্যমে মানবসত্তার চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা।

আবদিয়াতের নিগূঢ় দর্শন

মিরাজের থিমেটিক মূল ভিত্তি হলো ‘আবদ’ বা দাসত্বের সর্বোচ্চ শিখর। ইসলামী দর্শনে ‘আবদ’ হওয়া মানেই আল্লাহর রাব্বানিয়াতের আয়নায় নিজেকে বিলীন করা। অসংখ্য প্রসিদ্ধ তাফসিরকারক, মুহাদ্দিস ও উলামায়েকেরাম বুঝিয়েছেন যে, মিরাজ কোনো সাধারণ ভ্রমণ নয়, বরং এটি খোদায়ী মেহমানদারি। এখানে মানুষের সুপ্ত আবেগ এবং খোদার প্রতি অকৃত্রিম ইশকের প্রতিফলন ঘটে।

সমাজ ব্যবস্থায় আমরা যখন কোনো নেতার সাথে দেখা করি, তখন কেবল মানসিক উপস্থিতি যথেষ্ট নয়, দৈহিক উপস্থিতিও আবশ্যক। তেমনিভাবে, সৃষ্টির সেরা রসুলে পাক (সা.)-এর সশরীরে মিরাজ এটিই প্রমাণ করে যে, মানুষের এই নশ্বর দেহকেও আল্লাহ এমন মর্যাদা দিয়েছেন যে তা সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। ইসলামী দর্শন ত্বত্তের ভাষায় এটি হলো ‘ফানা ফিল্লাহ’ থেকে ‘বাকা বিল্লাহ’র দিকে এক অনন্ত যাত্রা। এখানে নৈতিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে এবং মানুষের মহিমা আরশের চেয়েও উচ্চতায় আসীন হয়।

নূরের গতি ও বোরাকের হাকিকত

মিরাজের বর্ণনায় ব্যবহৃত প্রতিটি উপাদান একেকটি গভীর আধ্যাত্মিক রূপক।

  • বোরাকঃ এটি কেবল দ্রুতগামী বাহন নয়, বরং এটি ‘প্রেমের ত্বরিত শক্তি’র প্রতীক। যে দূরত্ব পাড়ি দিতে লক্ষ বছর লাগে, ইশকের টানে তা এক পলকে অতিক্রান্ত হয়।

  • বায়তুল মুকাদ্দাসে ইমামতিঃ এটি রাসূল (সা.)-এর সকল আম্বিয়া ও রাসুলগণের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীকী ঘোষণা।

  • সিদরাতুল মুনতাহাঃ এটি জ্ঞানের ও অস্তিত্বের শেষ সীমারেখা। জিবরাঈল (আ.)-এর মতো মহান ফেরেশতাও যেখানে থমকে যান, সেখানে মানবাত্মা ও দেহের জয়যাত্রা শুরু হয়।

তাফসিরকারক, মুহাদ্দিস ও উলামায়েরোমগন শিখিয়েছেন যে, নবীজির দেহ মোবারক ছিল আগাগোড়া ‘নূর’। নূরের কোনো নির্দিষ্ট ওজন বা জড় জগতের সীমাবদ্ধতা থাকে না। তাই তাঁর সশরীরে ভ্রমণ কোনো বৈজ্ঞানিক অসম্ভবতা নয়, বরং তা ছিল নূরের ওপর নূরের সঞ্চালন।

সমালোচনামূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিঃ যুক্তি বনাম কুদরত

আধুনিক বস্তুবাদী দর্শনে অনেকে মিরাজকে ‘স্বপ্ন’ বলে উড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু যদি এটি কেবল স্বপ্ন হতো, তবে তা কুরাইশদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতো না। স্বপ্ন তো যেকোনো সাধারণ মানুষই দেখতে পারে। আবু জেহেল ও তার অনুসারীদের বিরোধিতাই প্রমাণ করে যে, নবীজি (সা.) সশরীরে ভ্রমণের দাবি করেছিলেন, যা তাদের সংকীর্ণ বুদ্ধিতে অসম্ভব মনে হয়েছিল।

বর্তমান বিজ্ঞান ‘টাইম ডাইলেশন’ (Time Dilation) বা সময়ের প্রসারণ নিয়ে কথা বলে। মিরাজের রাতে সময় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া এবং ফিরে এসে ওজুর পানির প্রবাহ দেখা—এগুলো কোয়ান্টাম ফিজিক্সের আধুনিক তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাফসিরকারক, মুহাদ্দিস ও উলামায়েকেরাম দেখিয়েছেন যে, মক্কার কাফেররা যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজা-জানালার সংখ্যা জানতে চেয়েছিল, নবীজি (সা.) রবের কুদরতে তা সরাসরি দেখে উত্তর দিয়েছিলেন। স্বপ্ন দেখে কি কেউ অপরিচিত কোনো স্থাপনার এমন নিখুঁত পরিসংখ্যান দিতে পারে? তাছাড়া স্বপ্ন দেখার জন্য ওজু করার শর্ত প্রযোজ্য নয় সুতরাং, এটি ছিল এক বাস্তব ও দৃশ্যমান মোজেজা।

 কুরআন ও হাদিসের অকাট্য দলিল

সশরীরে মিরাজের স্বপক্ষে কিছু জোরালো দলিল নিচে উপস্থাপন করা হলো:

  • কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণাঃ সূরা বনী ইসরাইলের প্রথম আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ ‘বি-আবদিহি’। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘আবদ’ শব্দটি তখনই ব্যবহৃত হয় যখন রূহ ও জাসাদ বা দেহ একত্রিত থাকে। কুরআন যদি শুধু রূহানি সফরের কথা বলত, তবে সেখানে ‘বি-রূহিহি’ ব্যবহৃত হতো।

  • হাদিসের বর্ণনাঃ সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, নবীজি (সা.) উম্মে হানির ঘরে ফিরে এসে দেখলেন তাঁর বিছানা তখনও গরম রয়েছে। এটি জাগতিক বা সশরীরে উপস্থিতির এক বাস্তব প্রমাণ।

  • আহলুল বাইয়েতের রেওয়ায়েত: ইমাম আলী (আ.)-এর বর্ণনামতে, মিরাজ ছিল রবের পক্ষ থেকে তাঁর বন্ধুকে দেওয়া এক পরম উপঢৌকন। আহলুল বাইয়েতের শিক্ষায় মিরাজকে অস্বীকার করা মানে হলো রসুলের পূর্ণাঙ্গ সত্তার (দেহ ও রূহের) শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করা। সুফি সাধকরা মনে করেন, যারা কেবল রূহানি মিরাজে বিশ্বাস করে, তারা নবীজির দৈহিক নূরানিয়াতের মাকাম বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

এক অনন্ত ভাবনার আলোকবর্তিকা

পরিশেষে বলা যায়, মিরাজ কেবল একটি ভ্রমণের গল্প নয়, এটি হলো মুমিনের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের সনদ। সশরীরে মিরাজ আমাদের শেখায় যে, ইবাদত ও ইশকের মাধ্যমে মানুষ তার এই জড় দেহকেও ঐশী নূরে রঞ্জিত করতে পারে। যুক্তি যেখানে তার ডানা ভেঙে পড়ে থাকে, ইমান ও এশকের শুরু সেখান থেকেই। মিরাজ হলো সেই ঘোষণা—যেখানে সৃষ্টি তার স্রষ্টার সাথে এক অনির্বচনীয় সেতুবন্ধনে আবদ্ধ হয়। সশরীরে মিরাজের এই ধ্রুব সত্যটি আমাদের বিশ্বাসকে আরও মজবুত করে এবং প্রমাণ করে যে, নবীজির কদম মোবারক যেখানে পৌঁছেছে, সৃষ্টিজগতের আর কারো পক্ষেই সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এটিই হলো কুরআন হাদিস ও ইসলামী দর্শনের নিগূঢ় নির্যাস।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.