সেজদাতে কামিনীর সুবাস

সেজদাতে কামিনীর সুবাস

সেদিন আকাশ থেকে রূপালি বৃষ্টির পরিবর্তে ঝরছিল শুদ্ধ নিঃশব্দতা। জ্যোৎস্নার চাদরটা যখন উঠোনের কোণে হেলান দিয়ে থাকা কামিনী গাছটার ওপর লুটিয়ে পড়ল, তখন মনে হলো প্রতিটি সাদা ফুল এক-একজন ঘুমন্ত ফেরেশতা। আকাশে তারার মেলা বসেছে ঠিকই, কিন্তু তারা আজ নিস্পৃহ নয়। একেকটা তারা যেন এক-একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন, যারা রাতের গভীরতায় উত্তর খুঁজছে।

জোনাকির বর্ণমালা

আমি যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, জোনাকিরা তখন আমার চারপাশে বাতাসের গায়ে অদৃশ্য নকশা কাটছিল। আপনি জানেন কি, জোনাকিরা আসলে কেবল আলো জ্বালায় না? তারা একেকটা হিরণ্ময় শব্দ। অন্ধকারের বুকচিরে তারা যখন জ্বলে ওঠে, তখন মনে হয় মহাকালের কোনো ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে যাওয়া বর্ণমালাগুলো আমার সাথে কথা বলতে চাইছে। বাতাসের ঝিরিঝিরি শব্দে আজ কোনো হাহাকার নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত সমর্পণ। সেই সমর্পণের টানে আমার শির লুটিয়ে আসছিল মাটিতে সিজদাহতে।

“মানুষ যখন মৌনতায় ডুবে যায়, তখন মহাবিশ্ব তার সাথে চুপিচুপি আপন ভাষায় কথা বলতে শুরু করে।”

মেঘের লুকোচুরি ও গোপন সুখ

চাঁদটা আজ বড় অবাধ্য। শুভ্র মেঘের আঁচল দিয়ে সে বারবার মুখ ঢাকছে, যেন এক লাজুক কিশোরী তার প্রথম প্রেমের কথা গোপন করতে চাইছে। এই আধারের অন্তরালে যে কী সুখ লুকিয়ে আছে, তা কেবল সেই জানে যার মনের গহীনে এক অলৌকিক নহর বয়ে যায়। সেই নহরের জল সাধারণ নয়; সেখানে ডুব দিলে পাওয়া যায় প্রভুর রহমতের মধুর-স্বাদ। আমার চারপাশের দেয়ালগুলো তখন আর ইট-পাথরের থাকে না, সেগুলো স্বচ্ছ হীরা হয়ে যায়—যাতে কেবল নিজের ভেতরের সত্তা আর মহান আল্লাহর করুণা প্রতিফলিত হয়।

কামিনীর সুবাস ও প্রাণের ধারা

হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় কামিনীর মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়ল আমার হৃদয়ে। কামিনী ফুলের সুবাস তো নয়, যেন কোনো জান্নাতি উচ্চারণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আমার মনে হলো, আমার চোখের জল আর অশ্রু নেই, সেগুলো নীল নীল নীলপদ্মে রূপান্তরিত হয়ে সিজদাহর জায়গায় ফুটে উঠছে। প্রতিটি পাপড়ি বলছে—সুবহানাহু ওয়াতায়ালার প্রেম ছাড়া আর সবই মরিচীকা।

আঁধার এখানে ভয়ের নয়, বরং এক পরম আশ্রয়ের। আমি যখন কপালটা মাটিতে ছোঁয়ালাম, তখন অনুভব করলাম পৃথিবীর সমস্ত হাহাকার থমকে গেছে। আমার ধমনীতে তখন রক্ত নয়, বরং বয়ে চলেছে মহান আল্লাহর প্রেমের এক অবিরাম ধারা। এই ধারাটি কোনো নদী নয়, এ হলো এক সুর যা কেবল হৃদয়ের কান দিয়ে শোনা যায়। হৃদয়ের তন্ত্রি দিয়ে অনুভব করা যায়।

নূরের নদী ও মাটির আরজি

রাত এখন আর প্রহর গুনছে না, সে এখন স্থির হয়ে আছে আমার হৃদয়ের আয়নায়। জোনাকিরা আজ আর কেবল উড়ছে না, তারা যেন আমার নিঃশ্বাসের ছন্দে স্পন্দিত হচ্ছে। একেকটা স্পন্দন যেন এক একটি ‘জিকির’, এক একটি নিদর্শন; যা বাতাসের গায়ে খোদাই হয়ে যাচ্ছে।

সেজদাহ যখন সমর্পণ

আমি যখন মাটির বুকে কপাল ঠেকালাম, অনুভব করলাম মাটি আজ কেবল ধুলিকণা নয়। এই মাটি যেন এক আদিম আশ্রয়, যে আমার সমস্ত অস্থিরতাকে শুষে নিচ্ছে। আমার চোখের পাতা থেকে ঝরে পড়া নোনা জলগুলো মাটিতে পড়তেই সেগুলো আর অশ্রু রইল না; সেগুলো ছোট ছোট স্বচ্ছ হীরায় রূপ নিল। প্রতিটি হীরায় প্রতিফলিত হতে লাগল আকাশের সেই অগণিত তারার মেলা। মনে হলো, আমি কেবল এই মাটির মেঝেতে নেই, আমি সিজদাহ দিয়েছি মহাকালের এক অসীম প্রান্তরে, যেখানে আকাশ আর জমিন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।

মেঘের আড়ালে পরম সখা

চাঁদটা যখন মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে, তখন মনে হচ্ছে পরম প্রিয়তম বুঝি আমার সাথে এক পবিত্র রসিকতায় মেতেছেন। আধারের এই অন্তরালে যে সুখ, তা কোনো পার্থিব আলোর সাধ্য নেই যে প্রকাশ করে।

“অন্ধকার তো আসলে কালো নয়, এ তো প্রভুর রহমতের এক নিবিড় ছায়া, যা কেবল তৃষ্ণার্ত আত্মাকেই ঢেকে রাখে।”

বাতাসে ভেসে আসা কামিনীর সুবাস এখন আর নাকে নয়, সরাসরি বিঁধছে আমার রূহু-তে। মনে হচ্ছে, এই সুবাস আমার জীবনের সমস্ত ধূসর স্মৃতিগুলোকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছে। কামিনী ফুলের একেকটা রেণু যেন একেকটা নূরের কণা, যা আমার সত্তাকে মধুময় করে তুলছে।

হৃদয়ে অলৌকিক নহর

আমার বুকের ভেতরে এখন আর কোনো হাহাকার নেই, নেই কোনো জাগতিক চাওয়ার কোলাহল। সেখানে এখন বয়ে চলেছে আল্লাহর প্রেমের এক প্রশান্ত মহা সমুদ্র। সেই সমুদ্রের স্রোত যখন বয়, তখন আমার মনে হয় আমার আঙুলের ডগা দিয়ে নীল আলো চুঁইয়ে পড়ছে। প্রতিটি রক্তবিন্দু তখন বলছে—’ইলাহি’ ‘ইলাহি’ ‘ইলাহি’।

মাথা তুলে যখন আকাশের দিকে তাকালাম, দেখলাম চাঁদ আর মেঘের সেই লুকোচুরি খেলা থেমে গেছে। পুরো আকাশটা যেন একটা বিশাল জায়নামাজ হয়ে লুটিয়ে পড়েছে আমার উঠোনে। আর আমি? আমি সেই অনন্ত প্রেমের সাগরে ভাসমান এক ক্ষুদ্র খড়কুটো, যার গন্তব্য কেবল সেই পরম সত্তার সানিধ্য।

অন্তিম প্রহরঃ ভোরের ওজু ও চিরন্তন শান্তি

রাত যখন তার শেষ প্রহরটি আকাশের কোলে সঁপে দেয়, তখন চারিদিকের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়। জোনাকিরা তখন তাদের ক্লান্ত আলো নিয়ে ফিরে যায় ঘাসের শিশিরে। আমি অনুভব করলাম, আমার অস্তিত্বের চারপাশটা এক অলৌকিক নূরের কুয়াশায় ঢেকে গেছে। এটি কুয়াশা নয়, যেন পরম প্রভুর এক শীতল আলিঙ্গন।

শিশিরে ভেজা দীর্ঘশ্বাস

কামিনী গাছটা থেকে শেষ বারের মতো একঝাঁক ফুল ঝরে পড়ল। মনে হলো তারা যেন ক্লান্ত পরিব্রাজক, সারারাত জেগে ইবাদত শেষে মাটির কোলে পরম শান্তিতে ঘুমানোর জায়গা খুঁজছে। প্রতিটি ফুলের পতন যেন এক একটি দীর্ঘশ্বাসের মুক্তি। মাটির সেই শিশিরে যখন আমার হাত স্পর্শ করল, মনে হলো আমি সাধারণ পানি দিয়ে নয়, বরং আকাশের অশ্রু দিয়ে পবিত্র হচ্ছি। সেই শীতলতা আমার হৃদয়ের তপ্ত প্রেমকে এক প্রশান্তির হিম শিতলতায় রূপ নিলো।

অন্ধকারের বিদায়, হৃদয়ের জয়

চাঁদটা এখন অনেক দূরে, ধীর পায়ে শুভ্র মেঘের পাহাড় পেরিয়ে দিগন্তের ওপারে বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু আমার মনের মাঝের সেই ‘চাঁদ’—যা আল্লাহর প্রেমের ধারা হয়ে বয়ে চলেছিল—তা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আঁধার তো চলে যায়, কিন্তু এই যে আঁধারের অন্তরালে পাওয়া সুখ, তা তো সূর্যের প্রখর আলোতেও ফুরিয়ে যায় না।

“পৃথিবীর সূর্য পূর্ব দিগন্তে উদিত হয়, কিন্তু প্রেমের সূর্য উদিত হয় কেবল বিনয়ী হৃদয়ের গহীনে।”

মহাজাগতিক শান্তি

আমি উঠে দাড়ালাম। আমার পা দু’টো যেন মাটির স্পর্শ পাচ্ছে না, মনে হচ্ছে আমি এক স্বপ্নময় মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটছি। শরীরের প্রতিটি লোমকূপ যেন এক একটি ক্ষুদ্র মুখ হয়ে শুকরিয়া আদায় করছে। সারা রাতের সেই প্রার্থনার সুর এখন আর কণ্ঠে নেই, তা মিশে গেছে আমার ধমনীতে, আমার নিঃশ্বাসে। জীবনটা এখন আর কোনো যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাস নয়, বরং প্রভুর রহমতের এক মধুময় কবিতা হয়ে আমার সামনে প্রসারিত।

পূব আকাশে যখন আলোর প্রথম রেখা দেখা দিল, তখন কামিনীর শেষ সুবাসটুকু আমার চুলে জড়িয়ে থেকে বিদায় নিল। আমি হাসলাম, কারণ আমি জানি—এই প্রেম জাগতিক নয়, এই প্রেম অবিনশ্বর।

তখন মনের অজান্তে মন গুনগুন করে উঠে-

হৃদয়ে নূরের নহর

জ্যোৎস্না চুইয়ে পড়ছে আজ কামিনীর শিয়রে,

সেজদায় নত মন, কার নাম জপে নিভৃত অন্তরে?

আকাশের নীলিমায় তারার ওই যে মিটিমিটি মেলা,

সে তো নক্ষত্র নয়, প্রভুর রহমতে সাজানো আলোর খেলা।

জোনাকিরা লিখে যায় বাতাসের গায়ে গোপন এক লিপি,

আঁধারের বুকে জ্বলে ওঠে যেন পরম প্রেমের প্রদীপটি।

নীরবতা কথা কয় আজ, নিস্তব্ধতা গায় গান—

সেই সুরে ভিজে যায় তৃষ্ণার্ত মরুসম এই প্রাণ।

মেঘের আঁচলে লুকোচুরি খেলে রূপালি ঐ চাঁদ,

ভুলিয়ে দিতে চায় পৃথিবীর যত বিষণ্ণ অবসাদ।

কামিনীর ঘ্রাণে মেশে আজ জান্নাতি এক ধারা,

আমি তো আমি নই, প্রভুর প্রেমে হয়েছি আজ দিশেহারা।

ঝিরিঝিরি বাতাসে যখন শির নুইয়ে পড়ে মাটিতে,

হৃদয় তখন কথা বলে এক অলৌকিক বাঁশিতে।

রহমতের মধুর-স্বাদে জীবন হয় যে মধুময়,

বুকের গহীনে কেবল আল্লাহর প্রেমের নহর বয়।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.