শহরের যান্ত্রিকতায় শীতের আমেজটা ঠিক বোঝা যায় না, কিন্তু গ্রামে পা রাখতেই কুয়াশার পাতলা চাদর আর হিমেল হাওয়া জানান দিচ্ছে—শীত জেঁকে বসেছে। ছোট বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে মাগরিবের পর একটু মোড়ের দিকে গিয়েছিলাম। সেখানেই দেখা হয়ে গেল স্কুল জীবনের বন্ধু জাফরের সাথে।
এক সময় জাফর ছিল প্রাণবন্ত, কর্পোরেট অফিসে দাপিয়ে বেড়ানো চশমা পরা সেই বুদ্ধিমান ছেলেটি। কিন্তু আজ চায়ের দোকানের টিমটিমে আলোয় ওকে দেখে চেনার উপায় নেই। গায়ের চাদরটা মলিন, চোখের নিচে কালি, আর চেহারায় একরাশ ক্লান্তি। কোনো কুশল বিনিময়ের সুযোগ না দিয়েই ও যেন মনের আগল খুলে দিল।
“আর পারতেছি না রে বন্ধু, জীবনের ওপর ঘৃণা ধরে গেছে,” জাফর এক চুমুক চা খেয়ে উদাসীনভাবে বলল। “বেঁচে থাকাটাই এখন বোঝা মনে হয়।”
আমি ওকে সান্ত্বনা দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ও হাত বাড়িয়ে আমাকে থামিয়ে দিল। জাফরের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত হাহাকার। ও বলতে লাগল, “জানিস, এই কনকনে শীতে এত রাতে কেন বাজারে আসলাম? শুধু এক পাতা ওষুধের জন্য। অথচ ঘরে আমার বৃদ্ধ বাবা-মা ধুঁকছেন।”
জাফর দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করল, “বাবা-মা জিনিসটা অন্যরকম রে। তাদের শরীর খারাপ হলেও তারা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করবে, আমাদের বলবে না পাছে আমরা দুশ্চিন্তা করি। আর আমার বউ? সামান্য সর্দি লেগে নাক বন্ধ হয়েছে, তাতেই সারা বাড়ি মাথায় তুলেছে। আমি বললাম, এক কাপ কড়া চা করে দিই, ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না, মুখ ভার করে শুয়ে আছে। আর তুই তো জানিস, বউয়ের মুখ ভার সহ্য করা কত কঠিন! তাই বাধ্য হয়ে এই অন্ধকারে এত মাইল পথ হেঁটে আসলাম ওষুধ নিতে। অথচ বাবা কাল থেকে কাশছে, একবারও মুখ ফুটে কিছু বলেনি।”
জাফরের কথাগুলো শুনে চারপাশের কুয়াশা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় দেখলাম জাফরের চোখ দুটো চিকচিক করছে। ও ওষুধ নিয়ে অন্ধকারের দিকে হাঁটা দিল।
আমি পেছনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম—জাফর কি শুধু ওষুধের জন্য ছুটছে? নাকি ও ছুটছে সমাজ আর সংসারের সেই অলিখিত নিয়মের পেছনে, যেখানে বাবা-মায়ের নিঃশব্দ ত্যাগ সবসময় আড়ালেই থেকে যায়, আর কাছের মানুষের সাময়িক অভিমান মেটাতেই জীবনের সবটুকু শক্তি ব্যয় হয়ে যায়।
ফিরে আসার সময় মনে হলো, শীতের এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডার চেয়েও জাফরের ভেতরের একাকিত্বের হিমটা বোধহয় অনেক বেশি তীব্র।
জাফরের ভেতরে এখন এক ধরণের ‘অস্তিত্বের সংকট’ কাজ করছে। সে এক সময় নিজেকে সফল ভাবত, কিন্তু এখন তার মনে হয় সে কেবল একটি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে, যার নিজের কোনো পছন্দ-অপছন্দ নেই। জাফর এখন সংসারের সেই স্তম্ভ, যে সবাইকে ধরে রাখছে কিন্তু তাকে ধরে রাখার মতো কেউ নেই। একদিকে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি তার না বলা অপরাধবোধ—যেখানে সে জানে তারা অবহেলিত হচ্ছে। অন্যদিকে স্ত্রীর আবদার মেটানোর বাধ্যবাধকতা। এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে সে নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলেছে।
একসময়ের ভালো চাকরি করা উজ্জ্বল জাফর এখন ‘ছাপোষা’। তার মেধা বা যোগ্যতা এখন আর কেউ মূল্যায়ন করে না। তার লড়াই এখন কেবল দুমুঠো ভাতের জন্য নয়, বরং প্রতিদিনের ছোটখাটো অশান্তি এড়িয়ে চলার জন্য। এই ‘মানিয়ে নেওয়া’র জীবন তাকে মানসিকভাবে নিঃস্ব করে দিয়েছে।
জাফর যে বন্ধুকে দেখেই গড়গড় করে কথাগুলো বলল, এটা তার মনের ভেতরে জমে থাকা বিশাল এক বাষ্পের বহিঃপ্রকাশ। সে আসলে কারও কাছে বিচার দিচ্ছে না, বরং নিজের ওপর জমে থাকা ঘৃণাটাই উগড়ে দিচ্ছে। তার কাছে জীবন এখন একটা অন্তহীন ‘লড়াই’, যেখানে জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই, শুধু টিকে থাকার গ্লানি আছে।
জাফর যখন অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল, তখন তার হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল এক ধরণের যান্ত্রিকতা। সে যেন হাঁটছে না, বরং একটা নিয়তি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আমি বুঝতে পারলাম, জাফর শুধু ওষুধের দোকানের দিকে যাচ্ছে না; সে যাচ্ছে তার সেই নিঃশব্দ কারাগারে, যেখানে তার বিসর্জনগুলো সাধারণ ঘটনা হিসেবে গণ্য হয়। সে হয়তো ভাবছে, কাল সকালে বাবা যখন আবার কাশবেন, সে হয়তো আবারও এড়িয়ে যাবে। এই যে নিজের নৈতিকতার কাছে বারবার হেরে যাওয়া—এটাই তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
তার চোখের সেই ম্লান দৃষ্টি বলছিল, সে আর ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে না। এখন তার কাছে ‘ভালো থাকা’ মানে হলো ঘরে কোনো অশান্তি না হওয়া। এই আত্মবিসর্জন তাকে এতটাই শূন্য করে দিয়েছে যে, সে এখন নিজের বেঁচে থাকার কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না।
জাফর যখন ওষুধের প্যাকেটটা পকেটে পুরল, আমি দেখলাম ওর হাত দুটো কাঁপছে। এটা কেবল শীতের কাঁপুনি নয়, বরং ভেতরের কোনো এক আগ্নেয়গিরি চেপে রাখার চেষ্টা। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ হেসে উঠল—তবে সে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল তীব্র এক বিষাদ।
“জানিস বন্ধু,” জাফর ধরা গলায় বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয় এই যে মাইলকে মাইল হাঁটছি, এই পথ যদি কোনোদিন শেষ না হতো! বাড়িতে ঢুকলেই মনে হয় আমি আর আমি নেই। সেখানে আমি কেবল একজন ‘যোগানদাতা’। মা-বাবার কাশির শব্দ শুনলে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে, অপরাধবোধে দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয়, কেন তাদের জন্য একটা ভালো কম্বল বা ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারছি না? অথচ সেই অপরাধবোধটুকু ঢেকে রেখে আমাকে হাসিমুখে স্ত্রীর সামনে দাঁড়াতে হয়, তার সর্দির ওষুধের খোঁজ নিতে হয়।”
ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। কুয়াশার আস্তরণে আজ চাঁদটাও ঢাকা পড়েছে। জাফর আবার বলতে শুরু করল, “বউ যখন মুখ ভার করে থাকে, তখন মনে হয় আমার অস্তিত্বটাই বুঝি ভুল। ওর অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতে আমি নিজের আত্মসম্মানটা কখন যে বিসর্জন দিয়েছি, টেরই পাইনি। এক সময় কত স্বপ্ন ছিল, কত বড় বড় প্রজেক্ট সামলাতাম! আর আজ? আজ আমি সামান্য এক পাতা ওষুধের জন্য মাইলকে মাইল পথ হাঁটা এক পরাজিত সৈনিক। আমার বাবা-মা তাদের সবটুকু দিয়ে আমাকে মানুষ করেছিলেন, আর আমি আজ তাদের এক কাপ তুলসী পাতার চাও খাওয়াতে পারি না বউয়ের অশান্তির ভয়ে।”
জাফর অন্ধকারের দিকে কয়েক পা বাড়িয়ে আবার ফিরে তাকাল। ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলোয় ওর মুখটা তখন মৃত মানুষের মতো ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল।
“সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি কী জানিস? মরে যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু মরারও অধিকার নেই। আমি মরে গেলে এই বুড়ো বাবা-মার কী হবে? আর ওই যে ঘরে শুয়ে মুখ ভার করে আছে, তার নতুন অজুহাত কে সহ্য করবে? তাই আমাকে বেঁচে থাকতে হয়। ঘৃণা নিয়ে, গ্লানি নিয়ে, এই ছাপোষা অস্তিত্ব নিয়ে প্রতিদিন তিলে তিলে মরতে হয়।”
কথাগুলো শেষ করে জাফর আর দাঁড়াল না। কুয়াশার গাঢ় অন্ধকারে ওর অবয়বটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। শুধু ওর জীর্ণ চাদরের ঘষা লাগার খসখস শব্দটা কিছুক্ষণ কানে এল, তারপর সব নিস্তব্ধ।
আমি মোড়ের চায়ের দোকানে একা দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশের শীতটা যেন হঠাৎ কয়েক গুণ বেড়ে গেল। আমার মনে হলো, জাফর একা যাচ্ছে না; এই সমাজের হাজারো ‘মধ্যবিত্ত জাফর’ এভাবেই প্রতিদিন নিজের মেরুদণ্ড ভেঙে পিষ্ট হচ্ছে দায়িত্ব আর আবেগের অসম লড়াইয়ে। ওষুধের প্যাকেটটা হয়তো তার স্ত্রীর সর্দি সারিয়ে দেবে, কিন্তু জাফরের মনের ভেতরে যে পচন ধরেছে, তার কোনো ওষুধ এই বাজারের কোনো দোকানেই নেই।
জাফর যখন অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল, আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকতেই স্মৃতির পাতায় ধুলো জমা এক কিশোর জাফরকে দেখতে পেলাম। ক্লাস নাইনের সেই ফুটবল টুর্নামেন্টের কথা মনে পড়ে গেল। সেদিন জাফর হাঁটুতে প্রচণ্ড চোট পেয়েও মাঠ ছাড়েনি। বলেছিল, “বাবা গ্যালারিতে বসে আছে রে, আমি মাঠ ছাড়লে বুড়ো মানুষটা কষ্ট পাবে।” খেলা শেষে ওর বাবা যখন ওর কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, “আমার বাঘের মতো ছেলে,” তখন জাফরের চোখে যে আত্মতৃপ্তির ঝিলিক দেখেছিলাম, আজ সেখানে কেবল ছাইচাপা হতাশা।
সেই তেজী ছেলেটা আজ কুঁজো হয়ে হাঁটছে। ও ওষুধের প্যাকেটটা পকেটে চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলল, “স্কুলে থাকতে ভাবতাম আকাশ ছোঁব, বাবাকে একটা বড় বাড়ি করে দেব। আর আজ দেখ, বাবার জন্য এক ফাইল কাশির সিরাপ কেনার টাকাটা দিয়ে বউয়ের জন্য দামি ব্র্যান্ডের সর্দির স্প্রে কিনতে হচ্ছে। কারণ ওই যে—মুখ ভার! বাবার নিরবতা সহ্য করা যায়, কিন্তু বউয়ের মুখ ভার মানে ঘরে নরক নেমে আসা।”
ও একটু থামল, তারপর ম্লান হেসে বলল, “জানিস, বাবা কাল রাতে খুব কাশছিল। আমি যখন কাছে গেলাম, বাবা চাদরটা গায়ে টেনে নিয়ে পাশ ফিরে শুলেন। অন্ধকারেও আমি বুঝতে পারছিলাম বাবা কাশ চাপার চেষ্টা করছেন, পাছে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আর আজ আমি সেই বাবার ওষুধের কথা ভুলে গিয়ে বউয়ের মান ভাঙাতে বাজারে দৌড়াচ্ছি। নিজেকে খুব নিচ মনে হচ্ছে রে, খুব নিচ!”
জাফরের গলার স্বর কান্নায় বুজে এল। ও আর কথা বাড়াল না। কুয়াশার চাদরে ঢাকা মেঠো পথ ধরে ওর ছায়াটা দীর্ঘ হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল।
আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম সেই মোড়ের মাথায়। জাফরের ফেলে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসগুলো যেন বাতাসের হিম হয়ে আমার গায়ে বিঁধছে। আমার মনে পড়ল স্কুল জীবনের সেই দিনগুলোর কথা, যখন আমাদের স্বপ্নগুলো ছিল নীল আকাশের মতো বিশাল। অথচ জীবন নামক এই নিষ্ঠুর জাঁতাকলে পড়ে জাফর আজ নিজের ছায়ার কাছেই পরবাসী।
গ্রামের নির্জন রাতে দূরে কোথাও একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল। মনে হলো, ওটা পাখি নয়, ওটা আসলে জাফরের মতো হাজারো মানুষের গুমরে মরা কান্নার শব্দ। যে কান্নার কোনো দর্শক নেই, কোনো সমব্যথী নেই। ঘরে ফিরে জাফর হয়তো দেখবে বউ ওষুধ পেয়ে খুশি হয়েছে, কিন্তু পাশের ঘরে তার বৃদ্ধ বাবা তখনো অন্ধকারে একা কাশছেন—আর জাফর সেই কাশির শব্দ শুনে বালিশে মুখ গুঁজে নিজের অস্তিত্বহীনতার গ্লানি ঢাকছে।
শীতের রাতটা আজ বড় বেশি দীর্ঘ মনে হচ্ছে।





মতামত দিন-