অস্তিত্বের অন্ধকার মহল

অস্তিত্বের অন্ধকার মহল

শিমুলের ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটা টিক টিক শব্দে জানান দিচ্ছে সময় থেমে নেই। অথচ জানালার ওপাশে বিকেলের ম্লান রোদটা যখন তার স্টাডি টেবিলের ওপর এসে পড়ল, তখন তার মনে হলো সময় আসলে থমকে গেছে গত পনেরো বছর ধরে। টেবিলের এক কোণে পড়ে থাকা একটা পুরনো ডায়েরি আর তার ভেতর শুকনো একগুচ্ছ বকুল—যার গন্ধ অনেক আগেই ফুরিয়েছে, কিন্তু স্মৃতিতে তা আজও অমলিন।

ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে শিমুলের হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ‘শিউলি’।

দীর্ঘ পনের বছর পর শিউলি শহরে এসেছে। একটি কফি শপে দেখা করার প্রস্তাব দিল সে। শিমুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কাঁচাপাকা চুলে হাত বোলাল। আয়নার প্রতিবিম্ব তাকে মনে করিয়ে দিল, এটা জীবনের সেই বেলা, যেখানে আবেগের চেয়ে বাস্তবতার ওজন বেশি। তবুও কেন জানি ভেতরের সুপ্ত ইচ্ছের শাখা-প্রশাখাগুলো আজ বসন্তের বাতাসের মতো নড়েচড়ে উঠল। দীর্ঘদিনের আলস্য ভেঙে এক অবাধ্য ঘোড়া যেন তার বুকের ভেতর খুরের আওয়াজ তুলে ছুটছে আর প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয়ের তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে পিটছে।

কফি শপের কোণের টেবিলটাতে শিউলি বসে ছিল। পরনে সাধারণ একটা মনিপুরি শাড়ি, মাথায় সাদা উড়না ও চোখে চশমা। আগের সেই উদ্ধত সৌন্দর্য হয়তো কিছুটা ম্লান হয়েছে, কিন্তু চোখের সেই নির্লিপ্ততা একবিন্দু কমেনি। শিমুল গিয়ে সামনে বসতেই শিউলি চশমাটা টেবিলের ওপর রাখল।

“কেমন আছ শিমুল?” কণ্ঠস্বরটা আগের মতোই ভরাট, কিন্তু সেখানে কোনো উষ্ণতা নেই।

শিমুল হাসল, তবে সে হাসিতে বিষণ্ণতা মাখা। সে ভাবল, এই চোখের দিকে তাকিয়ে সে একসময় মহাবিশ্ব খুঁজে পেত, অথচ আজ সেখানে কোনো ‘হাতছানি’ নেই। কোনো আহ্বান নেই। তবুও কেন তার পঞ্চেন্দ্রিয় আজ বিদ্রোহ করছে? কেন শিউলির গায়ের সেই পরিচিত সোঁদা গন্ধটা তার ঘ্রাণেন্দ্রিয় হয়ে মস্তিষ্কে এক মাতাল করা বার্তা পাঠাচ্ছে?

শিমুল মৃদুস্বরে বলল, “তুমি তো কোনোদিন ডাকোনি শিউলি। আজ কেন হঠাৎ?”

শিউলি জানালা দিয়ে বাইরে রাস্তার ট্রাফিক জ্যামের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “মানুষ কি সবসময় প্রয়োজনে ডাকে? হয়তো শুধু দেখতে চেয়েছিলাম সময় তোমাকে কতটা বদলেছে। কিন্তু দেখছি, তুমি আজও সেই আগের মতোই বিভ্রান্ত।”

শিমুল বুঝল, এটা সেই পুরনো অবহেলা। নির্মম, ধারালো। জীবনের এই পর্যায়ে এসে মানুষ সাধারণত থিতু হয়, শান্তি খোঁজে। কিন্তু শিমুলের অস্তিত্বের ‘অন্ধকার মহলে’ আজও এক অচেনা গুপ্তচর ঘুরে বেড়ায়। সেই গুপ্তচর আইন মানে না, ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা ফলক দেখে ভয় পায় না। সে বারবার হানা দেয় শিউলির ওই হৃদয়ে, যে হৃদয় আসলে এক মরা নদী।

“আমি জানি শিউলি,” শিমুল বলতে শুরু করল, “তোমার হৃদয়ে আমার জন্য কোনো জলধারা অবশিষ্ট নেই। ওটা এখন একটা শুকনো নদী, একটা ধূ-ধূ মরুভূমি। সেখানে নামলে তৃষ্ণা মেটে না, শুধু দহন বাড়ে। কিন্তু জানো তো, কিছু দহন হিরন্ময় হয়। জীবনের এই অপর বেলায় এসে আমি আর কোনো শীতল ঝর্ণা খুঁজছি না। আমি সেই আগুনটাই খুঁজছি যাতে পুড়লে কোনো ভস্ম থাকে না, কোনো চিহ্ন থাকে না।”

শিউলি এবার সরাসরি শিমুলের চোখের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে এক মুহূর্তের জন্য কি কোনো মায়া খেলে গেল? নাকি ওটা কেবলই বিকেলের রোদের কারসাজি? সে ধীর গলায় বলল, “এই জেদ তোমাকে শেষ করে দেবে শিমুল। আমার জীবনে এখন আর দেওয়ার মতো কিছু নেই। আমি দহন করতে চাই না, কিন্তু আমার কাছে শীতলতাও নেই। তুমি যে হিরন্ময় দহনের কথা বলছ, সেটা আসলে এক নিঃসঙ্গতা।”

শিমুল কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে জানে, এই আলাপচারিতা তাকে কোনো গন্তব্যে পৌঁছাবে না। শিউলি তাকে উপেক্ষা করেই যাবে, যেমনটা সে বরাবর করে এসেছে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের এই দোলাচলেই তাকে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে।

কফি শপ থেকে বেরিয়ে শিমুল যখন ফুটপাতে হাঁটতে শুরু করবে, তখন হয়ত সন্ধ্যা নামবে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় শহরটাকে বড় মায়াবী লাগবে। তার বুকের ভেতরে সেই ‘রিনিঝিনি’ শব্দটা তখনও থামবে না। সে বুঝতে পারল, জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে এসে এই দহনই তার একমাত্র প্রাপ্তি। মানুষের জীবন বড় বিচিত্র; কেউ শীতলতায় শান্তি পায়, আর কেউ আজীবন এক শুকনো নদীর তীরে বসে থেকে আগুনের তৃষ্ণায় বুক বাঁধে।

শিমুলের রক্তে তখন সেই ‘মাতাল বিষ’ সংক্রামিত হচ্ছে। সে জানে কাল সকালে আবার একঘেয়ে বাস্তব জীবন শুরু হবে, কিন্তু আজকের এই দহনের স্মৃতিটুকুই তাকে আগামীর অনেকগুলো নিঃসঙ্গ রাত পার করার শক্তি দেবে।

শিমুল আর শিউলির সেই ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলটা যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো। যেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই, আছে শুধু শব্দের পর শব্দ দিয়ে গেঁথে রাখা মানসিক এক মরণপণ লড়াই। শিমুলের ভেতরে যে টানাপোড়েন শুরু হলো, তা কোনো সাধারণ বিচ্ছেদ বা বিরহ নয়; এ হলো নিজের যুক্তির সাথে নিজের আবেগের এক আদিম দ্বন্দ্ব।

শিউলি যখন নির্লিপ্ত মুখে জানালার ওপাশে তাকিয়ে ছিল, শিমুল তখন নিজের ভেতরকার আয়নায় নিজেকেই প্রশ্ন করছিল—কেন আমি এখানে? কেন বারবার এই অসম্মানের গহ্বরে ঝাঁপ দিচ্ছি?”

শিমুলের মস্তিষ্কের এক পাশ বলছে, এই নারী তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। সে কোনোদিন তোমার দিকে প্রেমের হাত বাড়ায়নি, বরং প্রতিবার তোমাকে এক টুকরো দয়ার মতো করে দেখেছে। তোমার আত্মসম্মান কি এতই সস্তা? অন্যদিকে তার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। সেই হৃদপিণ্ড বলছে, সম্মান দিয়ে কী হবে যদি অস্তিত্বটাই মরুভূমি হয়ে থাকে? শিউলির অবহেলাও তো এক ধরণের ছোঁয়া।” এই যে দ্বিধা—একদিকে প্রৌঢ়ত্বের স্থিতধী জ্ঞান, অন্যদিকে তারুণ্যের সেই অবাধ্য হাহাকার—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে শিমুলের মনে হলো সে আসলে একটা ‘গুপ্তচর’, যে নিজের সত্তাকে চুরি করে শিউলির নিষিদ্ধ এলাকায় নিয়ে এসেছে।

শিউলি চশমাটা চোখে পরে ব্যাগটা টেনে নিল। এই চলে যাওয়ার উপক্রমটা শিমুলের বুকের ভেতর এক ধরণের ‘রিনিঝিনি’ শব্দ তুলল—তবে সেটা কোনো আনন্দের সুর নয়, সেটা কাঁচ ভাঙার শব্দ। সে ভাবল, এখনই কি তবে শেষ? আর কি কোনোদিন এই সোঁদা গন্ধের কাছে আসা হবে না?”

তার রক্তে তখন এক মাতাল বিষের সংক্রমণ। সে জানে, এই বিষ তাকে তিলে তিলে মারবে। শিউলির প্রতি তার এই টান এখন আর কেবল প্রেমে সীমাবদ্ধ নেই, এটা এখন একটা আসক্তি। একটা অসুস্থ তৃষ্ণা, যা জানে সামনের নদীটা শুকনো, তবুও সেখানে অবগাহন করতে চায়।

শিমুলের মনে হলো, সে আসলে এক ধরণের আত্মপীড়নে ভুগছে। শিউলি তাকে যত বেশি দূরে ঠেলে দিচ্ছে, তার প্রতি শিমুলের আকর্ষণ তত বেশি হিরন্ময় হয়ে উঠছে। সে নিজের মনেই বিড়বিড় করল—মানুষ কেন শান্তি চায়? শান্তির চেয়ে এই অস্থিরতা অনেক বেশি জীবন্ত।”

“তুমি কি কিছু বলবে শিমুল?” শিউলির প্রশ্নটা তীরের মতো বিঁধল।

শিমুলের ইচ্ছে হলো চিৎকার করে বলতে, ‘তোমাকে ঘৃণা করতে চাই বলেই বারবার ফিরে আসি, কিন্তু পারি না।’ অথচ তার মুখ দিয়ে বেরোল কেবল একরাশ দীর্ঘশ্বাস। সে বুঝতে পারল, তার এই মানসিক টানাপোড়েন কোনোদিন থামবে না। সে সারাজীবন এই ‘বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায়’ দুলবে।

শিউলি উঠে দাঁড়িয়ে যখন দরজার দিকে পা বাড়াল, শিমুল দেখল তার ছায়াটা দীর্ঘতর হচ্ছে। সে সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানত, এই দহনে কোনো ভস্ম থাকে না, কিন্তু অবশেষ হিসেবে থাকে এক আজন্ম বিষণ্ণতা। জীবনের এই ‘অপর বেলায়’ এসে সে উপলব্ধি করল—কিছু মানুষকে ভালোবেসে পাওয়া যায় না, কেবল তাদের দহনে নিজেকে পবিত্র করা যায়।

শিমুল সেই শূন্য চেয়ারটার দিকে হাত বাড়াল, যেন সেখানে এখনও শিউলির উপস্থিতির রেশ লেগে আছে। তার চারপাশের বাতাস তখন সেই ‘অচেনা গুপ্তচরের’ নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে। সে বুঝল, তার মুক্তি নেই। এই মানসিক বন্দিত্বই তার জীবনের পরম সত্য।

শিউলি যখন ক্যাফেটেরিয়ার কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বের হলো, তখন বাইরের শীতল বাতাস তার মুখে ঝাপটা দিল। সে একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে নির্বিকার। স্থির পদক্ষেপে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের ভেতরে এক অন্যরকম যুদ্ধের শব্দ পাচ্ছিল।

শিমুলের ধারণা শিউলি পাথর, তার হৃদয় শুকনো নদী। শিউলি জানে এটাই তার ঢাল। কিন্তু এই দীর্ঘ পনের বছর পর শিমুলের মুখোমুখি বসে তার নিজের ভেতরেও যে কতগুলো ফাটল চওড়া হয়েছে, সেটা সে ঘুণাক্ষরেও শিমুলকে বুঝতে দেয়নি।

শিউলি ভাবছিল শিমুলের সেই কথাগুলো—তৃষ্ণার্ত এই জীবন তোমার শুকনো নদীতে অবগাহন করতে চায়।’ সে মনে মনে হাসল। শিমুল শুধু তার নিজের তৃষ্ণাটাই দেখল, একবারও দেখল না কেন এই নদীটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শিউলির জীবনটা তো এমন ছিল না। একদিন তার বুকেও প্রেমের জোয়ার আসত, কিন্তু জীবনের রূঢ় বাস্তবতা আর একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতা সেই নদীকে তিলে তিলে মরুভূমি বানিয়ে দিয়েছে। সে নিজেকে পাথর করেছে সচেতনভাবে, যাতে আর কেউ সেখানে আঁচড় কাটতে না পারে।

শিমুলের চোখে আজ সে যে হাহাকার দেখল, সেটা তাকে অপরাধী করছিল। কিন্তু সে নিরুপায়। সে জানে, যদি একবার সে তার ওই বরফ-শীতল দেয়ালটা ভেঙে ফেলে, তবে শিমুল সেই দহনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। শিউলি শিমুলকে ফিরিয়ে দেয় তাকে ঘৃণা করে নয়, বরং তাকে রক্ষা করার জন্য।

হাঁটতে হাঁটতে শিউলি নিজের মনের সাথে কথা বলছিল—ওকে কেন বললাম আমার হৃদয় নদী কেবলই দহন? কারণ আমি চাই না ও আমার ধ্বংসস্তূপের ভাগীদার হোক।” শিমুলের কাছে যেটা অবহেলা, শিউলির কাছে সেটা এক ধরণের কঠোর ত্যাগ। সে লক্ষ্য করেছে শিমুলের কাঁচাপাকা চুল, তার থরথর করে কাঁপা হাতের আঙুল। দেখে তার বুকের গভীর কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা যে হয়নি তা নয়, কিন্তু সে তো সেই ব্যথাকে প্রশ্রয় দিতে শেখেনি। তার মস্তিষ্ক তাকে বারংবার সতর্ক করে—প্রবেশ নিষেধ” লেখা ফলকটা অন্যের জন্য নয়, ওটা তার নিজের আবেগের জন্যই সে টাঙিয়ে রেখেছে।

রাস্তার ধারের একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে শিউলি ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে চশমার কাঁচটা মুছল। তার চোখ কি সামান্য ভিজে উঠেছে? হয়তো। সে ভাবল, শিমুল যে ‘হিরন্ময় দহনের’ কথা বলছে, সেই দহন নিয়ে শিউলি বেঁচে আছে গত দেড় দশক। শিমুল তো কেবল বিকেলের এই আধঘণ্টা পুড়ল, কিন্তু শিউলি এই আগুনে জ্বলে জ্বলে আজ অঙ্গার।

সে জানে, আজ রাতে শিমুল হয়তো ডায়েরি লিখবে, হয়তো বিরহের কবিতায় নিজেকে সঁপে দেবে। আর শিউলি? সে ফিরে যাবে তার নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটে, যেখানে কেবল শূন্যতা তার সঙ্গী। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে—তুমি নিষ্ঠুর নও শিউলি, তুমি কেবল নিঃস্ব।”

শিমুলের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল যেমন সত্য, শিউলির এই ‘নিষ্ঠুর হওয়ার অভিনয়’ ততটুকুই বাস্তব। নদীর জল যখন শুকিয়ে যায়, তখন সে আর জীবন দিতে পারে না, কেবল সূর্যকে প্রতিফলিত করে দহন বাড়াতে পারে। শিউলি সেই বিষণ্ণ দহনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

রাস্তার দুই মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই মেরুর মানুষের জন্য কোনো মিলনের সুর বাজেনি, বরং বেজেছে এক মহাজাগতিক বিষণ্ণতার রাগিণী। ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে শিমুল উত্তর দিকে হাঁটছে, আর শিউলি দক্ষিণ দিকে। মাঝখানে পড়ে রইল দীর্ঘ বিশ বছরের এক অলঙ্ঘনীয় দূরত্ব।

শিমুল যখন নিজ গন্তব্যে পৌঁছাল, তখন শহরের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামার প্রস্তুতি চলছে। সে তার অন্ধকার স্টাডি রুমে গিয়ে বসল। কোনো আলো জ্বালল না। জানালার কাঁচের ওপাশে ঝোড়ো বাতাসের ঝাপটায় গাছের ডালগুলো আর্তনাদ করছে। শিমুল অনুভব করল, তার ভেতরে সেই ‘অচেনা গুপ্তচর’ এখন আর লুকিয়ে নেই; সে এখন তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে একচ্ছত্র অধিপতি।

শিমুলের মস্তিষ্কে শিউলির সেই শেষ উক্তিটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—এই দহন তোমাকে শেষ করে দেবে।” শিমুল মৃদু হাসল। সে তো জানত, যে নদীতে সে অবগাহন করতে চেয়েছিল, তা জলহীন এক আগুনের কুণ্ড। তবুও এই পড়ন্ত বিকেলে সেই আগুনের আঁচে সে যেন নিজের সারা জীবনের হাহাকারকে পুড়িয়ে পবিত্র করে নিল। কিছু দহন মানুষকে ছাই করে না, বরং তাকে এক অদ্ভুত শীতলতায় পৌঁছে দেয়। জীবনের এই শেষ বেলায় এসে শিমুল উপলব্ধি করল, সে শিউলিকে পায়নি ঠিকই, কিন্তু সে এমন এক দহন পেয়েছে যা কেবল হিরন্ময় নয়, তা অবিনশ্বর।

অন্যদিকে, শিউলি তখন তার নিস্তব্ধ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা তপ্ত পিচঢালা রাস্তায় পড়ে এক অদ্ভুত ‘সোঁদা গন্ধ’ ছড়াচ্ছে। ঠিক সেই গন্ধ, যা শিমুলের মস্তিষ্কে মাতাল বিষের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল। শিউলি হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির জল ছোঁয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পরক্ষণেই হাতটা গুটিয়ে নিল। সে তো প্রতিজ্ঞা করেছে, কোনো শীতলতাকে সে আর হৃদয়ে স্থান দেবে না।

তার মনে পড়ল শিমুলের সেই আর্জি—তবু সেই হিরন্ময় দহন চাই জীবনের এই অপর বেলায়।” শিউলি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকাল। সে বুঝল, শিমুল তাকে ভালোবেসেছে এক তীব্র তৃষ্ণায়, আর সে শিমুলকে ফিরিয়ে দিয়েছে এক চরম নিষ্ঠুরতায়। কিন্তু এই দুইয়ের মাঝে সত্যটা হলো—তারা দুজনেই দহনের শরিক। শিমুল পুড়ছে পাওয়ার আকাক্ষায়, আর শিউলি পুড়ছে না-পাওয়ার নিস্তব্ধতায়।

রাতের অন্ধকারে যখন বৃষ্টি নামল, তখন শহরের সব শব্দ ধুয়ে মুছে গেল। শুধু রয়ে গেল দুটি নিঃসঙ্গ মানুষের দীর্ঘশ্বাস। কেউ কাউকে কোনোদিন আর বলবে না—ভালোবাসি’। কোনোদিন আর ‘বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায়’ কেউ কাউকে প্রশ্ন করবে না।

শিমুল আর শিউলি—দুজন দুই মেরুর বাসিন্দা হয়েও এক জায়গায় এসে মিলে গেল। তারা দুজনেই এখন দহনের শিল্প শিখেছে। একজন আগুনের শিখাকে আলিঙ্গন করে, আর অন্যজন সেই আগুনের শিখা হয়ে। দহনই তাদের জীবনের শেষ পরিচ্ছেদ, যেখানে ভস্মও নেই, নেই কোনো চিহ্ন; শুধু আছে এক অবর্ণনীয় হিরন্ময় শূন্যতা।

শিমুল আর শিউলির ভবিষ্যৎ কোনো নাটকীয় মোড় বা আকস্মিক মিলনের দিকে এগোয়নি; বরং সময়ের স্রোতে তা এক গভীর ও প্রশান্ত দার্শনিক পরিণতির দিকে ধাবিত হয়েছে।

শিমুলের ভবিষ্যৎ কাটে এক অদ্ভুত একাকিত্বের ঘোরে। তবে এই একাকিত্ব তাকে গ্রাস করেনি, বরং তাকে ঋদ্ধ করেছে। সে তার জীবনের সেই ‘হিরন্ময় দহন’ আর ‘মস্তিষ্কের মাতাল বিষ’কে শব্দের রূপ দিতে শুরু করে। সে একজন নিভৃতচারী লেখক বা কবি হিসেবে পরিচিতি পায়। তার প্রতিটি লেখায় এক অদৃশ্য নারীর অবহেলা আর এক তৃষ্ণার্ত নদীর হাহাকার ফুটে ওঠে।

শিমুল বুঝতে পারে, শিউলি তাকে ধরা দিলে হয়তো সে সাধারণ এক সংসারী মানুষ হতো, কিন্তু এই যে সে পুড়ল, এই দহনই তাকে অমরত্ব দিয়েছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে সেই ‘নিষিদ্ধ মহলের গুপ্তচর’ হয়েই রয়ে যায়—তবে সেই মহলটি এখন আর শিউলির হৃদয় নয়, বরং তার নিজেরই স্মৃতির এক বিশাল আর্কাইভ। সে আর শিউলিকে খোঁজে না, বরং নিজের ভেতরকার দহনটুকুকেই সযত্নে লালন করে।

শিউলির ভবিষ্যৎ কাটে এক নিস্তরঙ্গ সমুদ্রের মতো। সে তার চারপাশের পাথুরে দেয়ালটাকে আরও শক্ত করে নেয়, কিন্তু তার ভেতরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন আসে। সে সমাজসেবা বা এমন কোনো কাজে নিজেকে সঁপে দেয় যেখানে আবেগ নেই, কিন্তু সেবা আছে। সে মানুষের ভিড়ে থেকেও নিজেকে আড়াল করে রাখে।

মাঝে মাঝে বৃষ্টির রাতে যখন সেই ‘সোঁদা গন্ধ’ তাকে ব্যাকুল করে, সে ডায়েরির পাতায় হাত রাখে, কিন্তু কিছুই লেখে না। তার ভবিষ্যৎ হলো এক পরম ‘মুক্তি’। সে শিমুলকে মুক্তি দিয়েছে তার নিষ্ঠুরতা দিয়ে, আর নিজেকে মুক্তি দিয়েছে সকল পিছুটান ছিন্ন করে। সে জানে, এই জীবনে তাদের আর দেখা হবে না, আর এই না-দেখা হওয়াটাই তাদের সম্পর্কের পবিত্রতম অংশ।

তাদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বাস্তব চিত্র হলো—তারা হয়ে ওঠে দুটি সমান্তরাল রেখা। যারা একে অপরকে দেখতে পায়, অনুভব করতে পারে, কিন্তু কোনোদিন স্পর্শ করতে পারে না।

বহু বছর পর, জীবনের একদম শেষ প্রান্তে এসে হয়তো কোনো বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বা নির্জন কোনো পার্কে তারা একে অপরের মুখোমুখি হবে। কিন্তু সেদিন আর কোনো ‘রিনিঝিনি’ শব্দ হবে না, রক্তে কোনো ‘মাতাল বিষ’ ছড়াবে না। তারা শুধু একে অপরের চোখের দিকে তাকাবে। সেই চাহনিতে কোনো অভিযোগ থাকবে না, থাকবে শুধু এক গভীর কৃতজ্ঞতা।

শিমুল কৃতজ্ঞ, কারণ শিউলির দহন তাকে নিজেকে চিনতে শিখিয়েছে।

শিউলি কৃতজ্ঞ, কারণ শিমুলের সেই অবাধ্য তৃষ্ণা তাকে অন্তত এক মুহূর্তের জন্য হলেও অনুভব করিয়েছিল যে সে এখনও পাথর হয়ে যায়নি।

চরিত্র দুটির এই পরিণতির পর আপনার কি মনে হয়, বাস্তব জীবনে কি মানুষ এভাবেই দহনকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকে? নাকি আপনার মতে তাদের অন্য কোনো সমাপ্তি হওয়া উচিত ছিল?

এ বিষয়ে আপনার যদি কোন মতামত থাকে তাহলে আমাদেরকে মন্তব্য করুন।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

বিভাগ সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.