এক রূপবতী কনের নীরব অঙ্গীকার
২০০৮ সাল। গ্রীষ্মের এক স্নিগ্ধ প্রভাতে ইতালির প্রবাসী পাত্র, যিনি শুধু অর্থবিত্তে নন, জ্ঞান ও মননশীলতায়ও ছিলেন ঋদ্ধ, তিনি আকাশের রূপবতী শ্যালিকা সুরভিকে বধূরূপে বরণের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। শ্যালিকার খ্যাতি ছিল তার কঠোর পর্দানশীলতার জন্য। তার চলন, বলন—সবকিছুতেই ছিল ইসলামের শালীনতার ছাপ। এই বিবাহ কেবল দুটি পরিবারের মিলন ছিল না, এটি ছিল বিশ্বাস আর আভিজাত্যের এক অঘোষিত সম্মেলন। আকাশের চোখে সেই দিনটি ছিল নিখুঁত, রাজকীয়। দামি খাবারের সুগন্ধ, ঝলমলে আলোর সমাহার, ১০ মণ দুধের দইয়ের ঐতিহ্য—যেন এক স্বপ্নিল উদযাপন।
অনুষ্ঠান শেষে: অপ্রত্যাশিত নীরবতা
বিশাল ভোজের পরে যখন বরযাত্রীরা বিদায় নিলেন, তখন আনন্দের রেশ তখনও বাতাসে লেগে ছিল। কিন্তু আকাশের শ্বশুর, যিনি ছিলেন পরিবারের নীরব স্তম্ভ, হঠাৎ সবাইকে অন্দরমহলে ডাকলেন। তাঁর মুখে ছিল না কোনো রাগ, শুধু এক গভীর প্রশান্তি, যা এক অকথিত ভার বহন করছিল।
আকাশের শ্বশুর বসলেন। তাঁর দৃষ্টি যেন ঘরের দেওয়াল ভেদ করে দূর কোনো আধ্যাত্মিক রাজ্যে পৌঁছে গেছে। তিনি শান্ত অথচ ভারী কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন সেই তিনটি শব্দ, যা মুহূর্তেই উৎসবের বাতাসকে স্তব্ধ করে দিল: “সাবানের পর্দা স্খলন হয়েছে।”
উপস্থিত সবাই হতবাক। কেউ যারা বয়সে কম তারা হাসলেন, কেউ বিরক্ত হলেন, অনেকে বিব্রতও হলেন—এমন এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। “সাবান? এ কেমন কথা, আব্বাজান? এটি তো সামান্য একটি বস্তু!”—ফিসফিস শুরু হলো।
কিন্তু শ্বশুর তাদের অবাক ও নীরব করে দিলেন। তাঁর চোখ দুটি ছিল যেন এক প্রাচীন প্রজ্ঞা বহনকারী, যা শুধু বস্তু নয়, বস্তুর পেছনের রহস্য দেখতে পায়।
মারেফতের শিক্ষা: বস্তুতে আত্মার ছাপ
আকাশের শ্বশুর দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস নিলেন, যেন পৃথিবীর সমস্ত ভার ফুসফুসে টেনে নিচ্ছেন। তারপর কোরআনের পর্দা সংক্রান্ত একটি আয়াতের মর্মার্থ এবং একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি শুরু করলেন এক গভীর আলোচনা:
“শোনো, তোমরা শুধু চোখের দেখাকে পর্দা বলো। ওড়না, বোরকা—এগুলো তো দেহের আবরণ। কিন্তু আমাদের ইসলামে মারেফত (গূঢ় আধ্যাত্মিক জ্ঞান) বলে একটা জিনিস আছে, যা আমাদের শেখায় যে, পর্দা শুধু চোখের নয়, মনের এবং বস্তুরও।”
তাঁর কথাগুলো ছিল তীক্ষ্ণ তীরের মতো, যা সরাসরি আত্মার গভীরে আঘাত হানল:
“আমাদের ঘরের বিবিরা যে সাবান ব্যবহার করেন, তা কি শুধুই সাবান? না। এর মধ্যে লেগে থাকে তাদের একান্ত ব্যক্তিগত ‘নিশানা’ (স্পর্শ, সুরভি, ব্যবহারের ধরন)। এটা তার হাতের আর্দ্রতা, তার একান্ত ব্যবহৃত সুগন্ধ বহন করে। আর সেই সাবান, অন্দরমহল থেকে এসে যখন একজন ‘পর-পুরুষের’ হাতে যায়, তখন সেই পুরুষ কি অজান্তে সেই পবিত্র পর্দার সামান্য অংশকে স্পর্শ করে না? সেই নারীটির ব্যক্তিগত সুরভি বা স্পর্শের ইঙ্গিত কি অজান্তে তার মনের গহীনে প্রবেশ করে না?” তোমরা সেই সাবান বিবাহের অনুষ্ঠানে হাত ধোয়ার জন্য ব্যবহার করতে দিয়ে আমার খানদানের পর্দা স্খলন করেছো, কে করেছো আমি তার নাম ধরছি না কিন্তু সে নিশ্চয় কোন ভালো কাজ কর নাই। ভবিৎষতে এহেন কাজ যেন আর কেউ না করে এবং যদি কেউ করে তাকে ক্ষমা করা হবে না।
আকাশের শ্বশুর উদাহরণ দিলেন, আমরা এক টুকরা ছেড়া কাপড় দিয়ে কুরআন শরিফের গেলাফ তৈরী করে থাকি, যখন সেটা কুরআনে পারানো হয় তখন সেটা আর কাপড় থাকে না তখন সেটা হয়ে যায় আমাদের ভালোবাসার বস্তু, পরিনত হয় সম্মানের বস্তুতে। আকাশের মনে হলো, যেন তার চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গেল। সাবানটি এখন আর সামান্য বস্তু নয়, তা যেন এক নীরব সাক্ষী, যা এক পবিত্র সীমানার প্রতীক। শ্বশুরমশাইয়ের এই সূক্ষ্ম উপলব্ধি, এই ‘সাবানের পর্দা’-র ব্যাখ্যা—তা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের অনেক ঊর্ধ্বে।
দেনমোহর রূপে পবিত্রতা
শ্বশুর যখন নীরব হলেন, তখন ঘরজুড়ে শুধু গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ। চোখের কোণ ছিল সিক্ত। সেদিন আকাশে কোনো হাসি বা বিদ্রূপ ছিল না, ছিল শুধু গভীর অনুশোচনা আর শ্রদ্ধাবোধ।
আকাশ সেদিন বুঝলেন, তাঁর শ্বশুর কেবল একজন ধার্মিক অভিভাবক নন; তিনি সেই দরবেশ, যিনি পার্থিব জীবনকে আধ্যাত্মিকতার মানদণ্ডে মাপেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, পর্দা হলো আত্মার সতর্কতা (Vigilance of the Soul)—যা জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র বিষয়ে আল্লাহর বিধানের প্রতিফলন খুঁজে নেয়।
বিয়ের সমস্ত দামি উপহার ছাপিয়ে, ‘সাবানের পর্দার’ এই শিক্ষাটিই হয়ে রইল আকাশের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা। সেদিন থেকে সাবানটি শুধু একটি পরিষ্কার করার উপকরণ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছিল পবিত্রতা, মারেফত এবং আত্মশুদ্ধির এক জীবন্ত প্রতীকে।






মন্তব্য করুন