shofiq.com
সোশ্যাল মিডিয়ায় পাইরেটেড কনটেন্ট, মৌলিকতার সঙ্কট ও অ্যালগরিদমের প্রয়োজনীয়তা

সোশ্যাল মিডিয়ায় পাইরেটেড কনটেন্ট: মৌলিকতার সঙ্কট ও অ্যালগরিদমের প্রয়োজনীয়তা

একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি যেমন তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করেছে, তেমনই জন্ম দিয়েছে এক নতুন সঙ্কটের—সেটি হলো ‘পাইরেটেড’ বা নকল কনটেন্টের ছড়াছড়ি। ফেসবুক, লিঙ্কডইন, টুইটার (বর্তমানে এক্স) কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের নিউজ ফিড ঘাঁটলেই চোখে পড়ে অসংখ্য লেখা, যার বেশিরভাগই ‘কপি-পেস্ট’ সংস্কৃতির শিকার। মৌলিক চিন্তা, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার ফসল প্রায়শই অন্যদের দ্বারা নিছক বাহবা কুড়ানোর হাতিয়ার হয়ে ঘুরে বেড়ায়, যা সমগ্র ডিজিটাল বাস্তুতন্ত্রে এক গভীর নৈতিক ও গুণগত অবক্ষয়ের সৃষ্টি করেছে।

পাইরেটেড কনটেন্টের প্রবাহ ও উৎস:

সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নকল লেখার স্রোত অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন ব্যবহারকারী লিঙ্কডইন-এ কোনো গভীর বিশ্লেষণমূলক পোস্ট করলেন, সঙ্গে সঙ্গেই তা ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে বা ব্যক্তিগত প্রোফাইলে হুবহু কপি হয়ে ছড়িয়ে পড়লো। আবার, কেউ হয়তো ফেসবুক থেকে আকর্ষণীয় কোনো উক্তি বা ছোট গল্প কপি করে নিজের লিঙ্কডইন প্রোফাইলে পোস্ট করে দিলেন, নিজের মৌলিক সৃষ্টি হিসেবে। এর বাইরে, বহু ব্লগ সাইট বা সংবাদপত্রের কলাম থেকে লেখা চুরি করে এনেও দিব্যি সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালে পোস্ট করা হয়।

স্বীকার করতেই হবে, দু-একটি মৌলিক ও মানসম্পন্ন লেখা একেবারে নেই তা নয়। কিন্তু মুশকিল হলো, সেই মৌলিক লেখাগুলোই মুহূর্তের মধ্যে কয়েক ডজন বা শত শত কপি-পেস্টারের হাতে পড়ে তার আসল স্রষ্টার নাম, পরিচয় ও স্বীকৃতিকে বিলীন করে দেয়। যারা সেই লেখাটি কপি করে, তারা লেখকের পরিশ্রমকে উপেক্ষা করে, কেবল নিজেদের জনপ্রিয়তা বা ‘লাইক-কমেন্ট’-এর সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই কাজ করে। এটি কার্যত ডিজিটাল চুরি বা Intellectual Property-র চরম লঙ্ঘন।

মৌলিকতার সঙ্কট ও এর প্রভাব:

এই ‘কপি-পেস্ট’ সংস্কৃতি কেবল লেখকদের স্বীকৃতি কেড়ে নেয় না, বরং প্ল্যাটফর্মের সামগ্রিক গুণমানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন একই লেখা বারবার, বিভিন্ন নামে, ঘুরে বেড়ায়, তখন সত্যিকারের মৌলিক, গভীর ও চিন্তামূলক কনটেন্ট ভিড়ের মধ্যে চাপা পড়ে যায়। ব্যবহারকারীরা একঘেয়েমি এবং পুনরাবৃত্তির শিকার হন, ফলস্বরূপ তারা প্ল্যাটফর্মের প্রতি আকর্ষণ হারাতে শুরু করেন। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় সৃজনশীলতার—যে লেখক ঘন্টার পর ঘন্টা সময় দিয়ে একটি নতুন চিন্তা বা ধারণাকে শব্দরূপ দিলেন, তিনি যখন দেখেন তার লেখাটি বিনা অনুমতিতে অন্যের নামে চলছে, তখন নতুন কিছু সৃষ্টির অনুপ্রেরণা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে।

অ্যালগরিদমের প্রয়োজনীয়তা: একটি সম্ভাব্য সমাধান:

এই সমস্যা সমাধানের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি কাঠিন্যপূর্ণ ‘কপিরাইট চেক অ্যালগরিদম’ প্রবর্তন করা একান্ত প্রয়োজন। যেমনটি ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ভিডিও বা অডিওর ক্ষেত্রে কপিরাইট চেক হয়, তেমনিভাবে লেখা বা টেক্সট কনটেন্টের জন্যও এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত।

যদি প্রতিটি লেখা পাবলিশ করার আগে একটি উন্নত অ্যালগরিদম দ্বারা পরীক্ষা করা হয়, যা লেখাটির মৌলিকতা ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে তার পূর্ব-প্রকাশের ইতিহাস যাচাই করবে—তাহলে এই পাইরেটেড কনটেন্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এই অ্যালগরিদম কপি-পেস্ট করা লেখাকে হয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশ হতে দেবে না, অথবা মূল লেখকের নাম ও উৎসের লিংক বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করার শর্ত আরোপ করবে। এমন একটি ব্যবস্থা চালু হলে:

১. মৌলিকতা উৎসাহিত হবে: ব্যবহারকারীরা জানবেন যে কপি করা লেখা চলনসই হবে না, ফলে তারা নিজস্ব চিন্তা প্রকাশে মনযোগী হবেন।

২. গুণমান বৃদ্ধি পাবে: প্ল্যাটফর্মের সামগ্রিক কনটেন্টের মান উন্নত হবে, যা ব্যবহারকারীদের জন্য আরও বেশি আকর্ষণীয় হবে।

৩. ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে: প্রকৃত লেখকের শ্রম ও মেধার স্বীকৃতি রক্ষা পাবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল আমাদের সমাজকে সংযুক্ত করা এবং মুক্তভাবে চিন্তার আদান-প্রদানকে সম্ভব করে তোলা। কিন্তু ‘কপি-পেস্ট’-এর অনৈতিক প্রতিযোগিতা সেই লক্ষ্যকে অনেকটাই ম্লান করেছে। এটি কেবল একটি ব্যবহারিক সমস্যা নয়, এটি সৃজনশীলতার প্রতি আমাদের সামাজিক মনোভাবের একটি প্রতিফলন। এই ডিজিটাল নৈরাজ্য থামাতে ব্যক্তিগত নৈতিকতা এবং প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ—দু’টোই প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী কপিরাইট চেক অ্যালগরিদম প্রবর্তন করা সময়ের দাবি, যা সোশ্যাল মিডিয়াকে কেবল সংযুক্তির মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং মৌলিকতা ও সৃজনশীলতার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

এই প্রকাশনাটির সর্বস্বত্ত লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। এই প্রকাশনার আংশিক বা সম্পুণাংশ অন্য যেকোন মিডিয়াতে লেখকের নামে ছাড়া অন্য কারও নামে প্রকাশ করা কপিরাইট আইন এ দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমুহ

    Recent Comments