কুদরতী আলপনা

কুদরতী আলপনা

আগুন রাঙা এক গোধূলি যখন দিগন্তের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছিল, ঠিক তখন গ্রামের শেষ প্রান্তে বৃদ্ধ মনসুর আলীর উঠোনে অলৌকিক এক ঘটনা ঘটল। মনসুর আলী যখন জায়নামাজে বসে দুহাত তুললেন, তাঁর আঙুলের ডগা থেকে ছোট ছোট জোনাকি বেরিয়ে আকাশের নীলিমায় মিশে যেতে লাগল।

সেই বিশাল নীল আকাশ, যার কোনো খুঁটি নেই, কোনো অবলম্বন নেই—কেবল এক অসীম কুদরতি ইশারায় যা ঝুলে আছে মহাকালের বুক চিরে।

কুদরতের আলপনা ও মাটির পৃথিবী

মনসুর আলীর চারপাশের উঠোনটা হঠাৎ করেই এক জীবন্ত ক্যানভাস হয়ে উঠল। মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে গেল জান্নাতি সুবাস। তিনি দেখলেন, এই শ্যামল পৃথিবীর প্রতিটি ঘাসফুল যেন একেকটি নিপুণ তুলির টানে আঁকা। এক অদৃশ্য শিল্পী যেন পরম মমতায় পাহাড়ের পিঠে ঝরনার পানিছবি এঁকে দিয়েছেন। সেই ঝরনাধারা যখন নিচে আছড়ে পড়ছে, মনে হচ্ছে পাহাড়ের বুক চিরে আনন্দের অশ্রু বয়ে যাচ্ছে।

সাগর তখন দূরে গর্জন করছিল। কিন্তু সেই শব্দে কোনো হাহাকার ছিল না; বরং সাগরের লোনা পানি ছিল অতলান্ত এক বিরহের কান্না, যা কেবল তীরের বালুকা বেলাকেই শোনানো যায়। মনসুর আলী অনুভব করলেন, তাঁর অস্তিত্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু এক সুরে গাইছে—ওগো আল্লাহ, শোকর তোমার, আমারে যে তোমার ইমানের করুনা দান করেছো।”

নিশিরাতের প্রদীপ ও জীবনের গান

রাত বাড়লে যখন পৃথিবী নিঝুম হয়ে এল, তখন দূর নীলিমায় ফুটে উঠল হাজারো আলোর প্রদীপ। সে তো কেবল নক্ষত্র নয়, সে যেন এক মরমী কবির জ্বালিয়ে রাখা মোমবাতি। মনসুর আলীর জীর্ণ কুটিরের দেয়ালগুলো তখন স্বচ্ছ কাঁচের মতো হয়ে গেল। তিনি দেখতে পেলেন পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টি—পিঁপড়া থেকে শুরু করে বিশাল তিমি—সবাই নিজের ভাষায় এক নিগূঢ় সংগীতে মগ্ন।

বাতাস যখন বয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল বনের পাতাগুলো একে অপরের কানে কানে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলছে। জীবনের এই যে কলতান, এই যে প্রাণস্পন্দন—এ সবই তো তাঁরই দেওয়া সুর।

মরণ এবং এক প্রশান্তির শেষ

হঠাৎ মনসুর আলীর মনে হলো, তাঁর ঘরের কোণে রাখা পুরনো খাতাটার পাতাগুলো নিজে নিজেই উল্টে যাচ্ছে। সেখানে একটি পাতায় সোনালি অক্ষরে তাঁর নাম লেখা, আর তার ঠিক নিচেই একটি অদৃশ্য কালিতে লেখা ‘মরণ’।

যিনি এই সুন্দর ভুবনে পাঠিয়েছেন, তিনিই তো মরণের চাদরে জড়িয়ে আবার ফিরিয়ে নেবেন। এই সত্যটি কোনো ভয় হয়ে এল না, বরং এল এক পরম শান্তির পরশ হয়ে। নীল আকাশের বিশালতা যেমন মাটিকে আগলে রাখে, মৃত্যুও যেন তেমনি এক অনন্ত কোল।

জানলার বাইরে তখন জ্যোৎস্নার ফুল ফুটছে। মনসুর আলী চোখ বুজলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক চিলতে হাসি—সেই হাসি যা কেবল তৃপ্ত হৃদয়েই ফোটে। ধুলিকণার মতো তুচ্ছ জীবনটাও আজ এক মহাকাব্যের মতো মহিমান্বিত হয়ে উঠল। আকাশের নীলিমা আর মাটির শ্যামলতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল তাঁর শেষ নিশ্বাসে।

সেদিন আসর সালাতের পর যখন রোদের সোনালি চাদরটা পাহাড়ের গায়ে লুটোপুটি খাচ্ছিল, ঠিক তখনই আশ্চর্য এক নীরবতা নামল গ্রামের বুকে। মনসুর যখন পুকুরঘাটে ওজু করতে নামলেন, তাঁর হাতের স্পর্শে পানির ওপর ছোট ছোট নীল পদ্ম ফুটে উঠতে লাগল। সে কোনো সাধারণ ফুল নয়—সে তো বিশ্বাসের সুবাসে ভরা একেকটি অলৌকিক রেণু।

আকাশের দিকে তাকালে বুকটা জুড়িয়ে যায়। কোনো থাম নেই, কোনো লোহার খুঁটি নেই—তবুও এক অসীম ইশারায় সেই নীল সামিয়ানা ঝুলে আছে জগতের ওপর। মেঘেদের দীর্ঘশ্বাসে যখন আকাশ ভারী হয়, তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে কুদরতের করুণা। মনসুর বিড়বিড় করে বললেন, “এই যে বিশাল নীলিমা, এর কারিগর কতই না নিপুণ!”

সাগরের কান্না ও পাহাড়ের সুর

মনসুরের মনে হলো, তিনি শুনতে পাচ্ছেন সাগরের নোনা জলের বুক ফাটা কান্না। বিশাল সেই পানিরাশি অবিরত আছড়ে পড়ছে তটে, যেন স্রষ্টাকে ছোঁয়ার এক ব্যাকুল তৃষ্ণা। আবার যখন পাহাড়ের কথা ভাবলেন, মনে হলো পাষাণ হৃদয়েও তিনি ঝরনা দিয়েছেন। সেই ঝরনা তো পানি নয়, সে তো পাহাড়ের বুকের ভেতর থেকে উপচে পড়া কৃতজ্ঞতার সুর।

শ্যামল এই পৃথিবীটা যেন এক জীবন্ত আলপনা। বনের সবুজ পাতাগুলো বাতাসের দোলায় যখন কথা বলে ওঠে, মনে হয় তারা আল্লাহর তসবিহ পাঠ করছে। প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি ঘাসফুল আজ মনসুরের চোখে এক একটি মহাকাব্য হয়ে ধরা দিল।

নক্ষত্রের প্রদীপ ও জীবনের খাতা

রাত যখন গভীর হলো, আকাশের গায়ে জ্বলে উঠল হাজারো প্রদীপ। সে তো কেবল নক্ষত্র নয়, সে যেন অন্ধকারের বুকে জ্বালানো বিশ্বাসের একেকটি মশাল। মনসুর দেখলেন, তাঁর উঠোনের শিউলি গাছ থেকে ফুলের বদলে ঝরছে রূপালি আলো। সেই আলোয় দেখা গেল এক অদৃশ্য খাতা—জীবনের খাতা।

যিনি এই সুন্দর ভুবনে আমাদের প্রাণ দিয়েছেন, গান গাইবার গলা দিয়েছেন, তিনিই তো আবার নিঝুম সন্ধ্যায় মরণের চাদর পরিয়ে দেবেন। জন্মানোর ক্ষণেই তো সেই খাতার কোণে মৃত্যুর অমোঘ লিপি লেখা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ মনসুরের মনে কোনো ভয় নেই। কারণ তিনি জানেন, যাঁর হাতে এই আকাশ আর সাগরের চাবিকাঠি, তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া মানে তো আপন ঘরে ফেরা।

এক দীর্ঘস্থায়ী প্রশান্তি

শেষ রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, মনসুর অনুভব করলেন তাঁর শরীরের ভার হালকা হয়ে আসছে। তাঁর দুশ্চিন্তাগুলো নীল রঙের প্রজাপতি হয়ে উড়ে গেল জানলা দিয়ে। এক গভীর প্রশান্তি তাঁর চারপাশকে মখমলের মতো জড়িয়ে ধরল।

তিনি বুঝতে পারলেন, এই বিশাল সৃষ্টিজগতে তিনি কেবল একজন পথিক নন, বরং এক মহান দয়াময়ের পরম আদরের সৃষ্টি। তাঁর ঠোঁট দুটি শেষবারের মতো কেঁপে উঠল এক কৃতজ্ঞতায়—ওগো আল্লাহ, শোকর তোমার, আমারে যে মুসলিম করেছো।”

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে, আর আকাশের নীলিমা এক নতুন রহমত নিয়ে পৃথিবীর কপালে চুমু খাচ্ছে।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

সাম্প্রতিক প্রকাশনাসমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.