বিলাসিতার অন্তরালে মহাপাপঃ খাদ্য অপচয় রোধে ইসলামের নির্দেশনা

বিলাসিতার অন্তরালে মহাপাপঃ খাদ্য অপচয় রোধে ইসলামের নির্দেশনা

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মহান আল্লাহ তাআলা যেসব নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে ‘খাদ্য’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ। আধুনিক পৃথিবীতে একদিকে যখন কোটি কোটি মানুষ একবেলা আধপেটা খেয়ে কিংবা অনাহারে দিনাতিপাত করছে, অন্যদিকে তখন একদল মানুষ কেবল বিলাসিতা ও আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য টন টন খাবার ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করছে। ইসলামী জীবনদর্শনে খাদ্য অপচয় কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক অপরাধ এবং মহান রবের দেওয়া নেয়ামতের চরম অবমাননা। কোরআন, সুন্নাহ এবং আহলুল বায়তের (আ.) শিক্ষা অনুযায়ী, খাদ্য অপচয় সরাসরি শয়তানি আচরণের শামিল।
১. পবিত্র কোরআনের কঠোর হুঁশিয়ারি
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা অপচয়কারীকে শয়তানের সাথে তুলনা করেছেন। বিলাসিতার বশবর্তী হয়ে যারা সম্পদ ও খাদ্য নষ্ট করে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
“নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই; আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।”
(সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াতঃ ২৭)
অন্যত্র আল্লাহ পরিষ্কারভাবে খাওয়ার অনুমতি দিলেও সীমানা অতিক্রম করতে নিষেধ করেছেনঃ
وكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।”
(সুরা আরাফ, আয়াতঃ ৩১)
২. সুন্নাহর আলোকে খাবারের মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ (সা.) খাবারের প্রতিটি দানার প্রতি সম্মান দেখাতেন। এমনকি খাবারের পাত্রে লেগে থাকা সামান্য অংশটুকুও নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন।
হাদিস:
عَنْ جَابِرٍ قَالَ أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِسَلْتِ الصَّحْفَةِ وَقَالَ ‏: “إِنَّكُمْ لاَ تَدْرُونَ فِي أَيِّ طَعَامِكُمُ الْبَرَكَةُ”
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আঙুল এবং থালা চেটে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন: “তোমরা জানো না তোমাদের খাবারের কোন অংশে বরকত (কল্যাণ) লুকিয়ে আছে।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২০৩৩)
৩. আহলুল বায়ত (আ.)-এর দৃষ্টিতে ক্ষুদ্রতম অপচয়
আহলুল বায়তের ইমামগণ অপচয়ের সংজ্ঞাকে অতি সূক্ষ্ম স্তরে নিয়ে গেছেন, যাতে মানুষ সচেতন হয়। ইমাম জাফর আল-সাদিক (আ.) বলেনঃ
أدنى الإسراف هراقة فضل الماء
“অপচয়ের সর্বনিম্ন স্তর হলো— গ্লাসের অবশিষ্ট পানিটুকু (তৃষ্ণা মেটানোর পর) ফেলে দেওয়া।”
(বিহারুল আনোয়ার, খণ্ড ৭২)
ইমাম আলী (আ.)-এর জীবন ছিল মিতব্যয়িতার মূর্ত প্রতীক। তিনি বলতেন, বিলাসিতার নামে আতিশয্য করা হলো দরিদ্রদের হক নষ্ট করার নামান্তর। তাঁর মতে, সম্পদ থাকা মানেই তা যথেচ্ছ উড়ানো নয়, বরং তা আমানত হিসেবে রক্ষা করা।
৪. খাদ্য অপচয় ও নিরাপত্তার হুমকি
খাদ্য অপচয় সরাসরি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। যখন কোনো জাতি বিলাসিতার নামে খাবার নষ্ট করে, তখন সেই সমাজ থেকে ‘বরকত’ উঠে যায়। এটি কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক জুলুম।
* সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাঃ একজনের অতিরিক্ত খাবার ফেলে দেওয়া মানে অন্য একজনের প্লেট শূন্য রাখা। এটি সমাজে বৈষম্য ও অস্থিরতা তৈরি করে।
* জবাবদিহিতাঃ কিয়ামতের ময়দানে প্রতিটি নেয়ামতের হিসাব দিতে হবে। অতিরিক্ত খাবার কেন নষ্ট হলো, তার উত্তরদাতার জন্য হাশরের ময়দান হবে অত্যন্ত কঠিন।
পরিশেষে বলা যায়, বিলাসিতা ও উৎসবের নামে খাদ্য অপচয় ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। এটি একটি গর্হিত কাজ যা ব্যক্তিকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আমাদের উচিত সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে খাবারের পরিমিত আয়োজন করা এবং উদ্বৃত্ত খাবার অপচয় না করে অভাবীদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া। মনে রাখা প্রয়োজন, আজকের অপচয়কৃত খাবারই হতে পারতো কোনো অনাহারী শিশুর শেষ আশ্রয়।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

বিভাগ সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.