ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান বা ‘দীন’। এটি মানুষের জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত—এমনকি মৃত্যুর পরবর্তী ধাপগুলো নিয়েও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা দেয়। বর্তমান বিশ্বের আধুনিক বিজ্ঞান, পরিবেশবিদ্যা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইসলামী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা দাফন পদ্ধতি কেন সর্বশ্রেষ্ঠ, তার একটি গভীর বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. লাশের মর্যাদা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামী শরিয়তে মৃতদেহকে “নিথর বস্তু” হিসেবে নয়, বরং “সম্মানিত মানুষ” হিসেবে দেখা হয়। মৃতদেহ আত্মার জন্য একটি পবিত্র আমানত।
-
ইসলামের অবস্থান: হাদিস অনুযায়ী, মৃতদেহের সাথে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না যা জীবিত অবস্থায় তার কষ্টের কারণ হতো। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কঠিন সতর্কবার্তা রয়েছেঃ
-
كَسْرُ عَظْمِ الْمَيِّتِ كَكَسْرِهِ حَيًّا
-
“মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙার মতোই (অপরাধ ও কষ্টের)।” (সুনানে আবু দাউদ)
-
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: আগুনে পোড়ানো (Cremation) বা শকুন দিয়ে খাওয়ানো (Sky Burial) ইসলামের দৃষ্টিতে লাশের চরম অবমাননা। দাহ করার সময় হাড় ও মাংস পুড়ে কয়লা হয়ে যায়, যা স্বজনদের জন্য মানসিকভাবে পীড়াদায়ক। পক্ষান্তরে, কবরে শোয়ানো হলো একজন ক্লান্ত মানুষকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার মতো এক পরম মমতাময় বিদায়।
২. পরিবেশগত প্রভাব (Environmental Impact)
বর্তমান বিশ্বে ‘গ্রিন ফিউনারেল’ বা পরিবেশবান্ধব অন্ত্যেষ্টির কথা বলা হচ্ছে, যার সাথে ইসলামের দাফন পদ্ধতির হুবহু মিল রয়েছে।
-
বায়ুদূষণ রোধ: একটি মানবদেহ দাহ করতে প্রায় ৪০০-৬০০ কেজি কাঠের প্রয়োজন হয়। এটি প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছড়ায়। ইসলামি দাফন পদ্ধতিতে বায়ুদূষণের কোনো সুযোগ নেই।
-
মাটির উর্বরতা ও পুষ্টিচক্র: বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Nutrient Cycling’। মানুষের শরীরে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং ক্যালসিয়ামের মতো মূল্যবান উপাদান থাকে। কফিন ছাড়া সরাসরি মাটিতে দাফন করার ফলে দেহ প্রাকৃতিক জৈব সারে পরিণত হয়, যা মাটির খাদ্যচক্রকে সচল রাখে।
-
জলদূষণ রোধ: দেহ বা ভস্ম নদীতে ভাসিয়ে দিলে পানীয় জলের উৎস দূষিত হয়। কবরের সাড়ে তিন হাত মাটির স্তর একটি প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, যা ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষণমুক্ত রাখে।
৩. কুরআন ও হাদিসের আলোকে ‘মাটির’ গভীর দর্শন
ইসলাম মনে করে মানুষ এবং মাটি একই উপাদানে তৈরি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এই সত্যটি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেনঃ
۞ مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَىٰ
“আমি তোমাদের মাটি থেকেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে দেব এবং সেখান থেকেই পুনরায় তোমাদের বের করে আনব।” (সূরা ত্বহা: ৫৫)
-
রাসায়নিক মিল: আধুনিক রসায়ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাটিতে বিদ্যমান আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম মানুষের শরীরের কোষ গঠনেও প্রধান ভূমিকা রাখে। তাই দাফনের মাধ্যমে দেহকে তার আদি উপাদানে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
-
সাড়ে তিন হাতের রহস্য: ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী কবরের গভীরতা হতে হবে বুক সমান। ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.) বলেন:
“মৃত ব্যক্তিকে মাটির গভীরে দাফন করা হয় যেন তার শরীরের দুর্গন্ধ কাউকে কষ্ট না দেয় এবং কোনো হিংস্র প্রাণী যেন তাকে বের করতে না পারে।” বিজ্ঞান বলে, এই গভীরতায় ব্যাকটেরিয়া সবচেয়ে সক্রিয় থাকে, যা দ্রুত এবং দুর্গন্ধহীন পচনে সহায়তা করে।
৪. মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব
-
শোকের স্মৃতিস্তম্ভ: দাফনের পর একটি নির্দিষ্ট কবর থাকে, যেখানে স্বজনরা গিয়ে জিয়ারত করতে পারেন। এটি শোকাতুর পরিবারকে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়।
-
অর্থনৈতিক সমতা: হিন্দু বা খ্রিস্টান ধর্মে সৎকার অত্যন্ত ব্যয়বহুল (কাঠ কেনা বা দামি কফিন)। ইসলামে সৎকার অত্যন্ত সাধারণ ও সাশ্রয়ী। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেনঃ
أَسْرِعُوا بِالْجِنَازَةِ
-
“তোমরা জানাজা (ও দাফনের) কাজ দ্রুত সম্পন্ন করো।” (সহীহ বুখারী)
এই দ্রুত ও সাধারণ পদ্ধতি দরিদ্র পরিবারকে ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি দেয়।
৫. তুলনামূলক সারণী: ইসলাম বনাম অন্যান্য পদ্ধতি
| বৈশিষ্ট্য | ইসলামি দাফন | দাহ (Cremation) | উন্মুক্ত রাখা (Sky Burial) |
| পরিবেশ | সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। | বায়ুদূষণ ও বৃক্ষ নিধন ঘটায়। | রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি। |
| মর্যাদা | সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপদ শয়ন। | উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ফেলা। | বন্য প্রাণী বা পাখির ভক্ষণ। |
| দর্শন | মাটি থেকে সৃষ্টি, মাটিতেই প্রত্যাবর্তন। | পঞ্চভূতে বিলীন হওয়া। | প্রকৃতির কাছে উৎসর্গ। |
| খরচ | অত্যন্ত নগণ্য। | কাঠ বা বিদ্যুতের জন্য ব্যয়বহুল। | বিশেষ স্থাপনা প্রয়োজন। |
ইসলামি দাফন পদ্ধতিটি একদিকে যেমন স্রষ্টার বিধান ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসারী, তেমনি এটি আধুনিক ইকোলজি (Ecology) এবং পাবলিক হেলথ বিজ্ঞানের সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি মৃতদেহের গোপনীয়তা রক্ষা করে এবং পৃথিবীর বাস্তুসংস্থান নষ্ট না করে মানুষকে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ফিরিয়ে নেয়। তাই বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক উভয় বিচারেই দাফন পদ্ধতিই সর্বশ্রেষ্ঠ।





মতামত দিন-