ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটা যেন একটা ছোট হাতুড়ি দিয়ে সময়ের কপালে আঘাত করে চলেছে। টিক্, টিক্, টিক্…
শরিফুল দেখল, বিকেলের ম্লান রোদটা জানালার গ্রিল গলে তার স্টাডি টেবিলের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ঠিক যেখানটায় একটা পুরনো ডায়েরি ধুলোর আস্তরণ নিয়ে পড়ে থাকে। রোদটা পড়তেই ডায়েরির ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকা শুকনো বকুল ফুলের পাপড়িগুলো যেন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পনের বছর আগের ঘ্রাণ এখন মৃত, কিন্তু টেবিলের ওপর যে ছায়াটা দীর্ঘ হচ্ছে, সেটা আজও অবিকল পনের বছর আগের মতোই গভীর।
ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলোয় একটি নাম ফুটে উঠতেই ঘরের স্থির বাতাস যেন হঠাৎ তপ্ত হয়ে উঠল—’করবী’।
শরিফুল কয়েক মুহূর্ত স্থাণুর মতো চেয়ে রইল। তার বুকের বাম পাশে একটা অবাধ্য ঘোড়া যেন খুরের আওয়াজ তুলে ছুটতে শুরু করেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের কাঁচাপাকা চুলে আঙুল চালালো। আয়নার প্রতিবিম্বটা তাকে উপহাস করে বলল, “এটা বেলা শেষের গান শরিফুল, এখানে আবেগ মানেই পরাজয়।” কিন্তু তার রক্তে তখন এক মাতাল বিষের সংক্রমণ শুরু হয়েছে।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে কফি শপটার আবছা আলোয় সে যখন পৌঁছাল, দেখল কর্নারের টেবিলে করবী বসে আছে। পরনে একটি ঘিয়ে রঙের মণিপুরি শাড়ি, মাথায় সাদা ওড়না। চশমার কাঁচের ওপাশে তার চোখ দুটো যেন এক শান্ত অথচ গভীর জলাশয়। শরিফুল গিয়ে সামনে বসতেই করবী চশমাটা টেবিলের ওপর রাখল।
“কেমন আছ শরিফুল?”
কণ্ঠস্বরটা ভরাট, ঠিক আগের মতোই। কিন্তু সেখানে কোনো আশ্রয়ের রেশ নেই। যেন কোনো হিমশৈলের গা বেয়ে শব্দগুলো নেমে আসছে।
শরিফুল হাসল, তবে সেই হাসিতে বিষণ্ণতার ছোপ। সে ভাবল, একসময় এই চোখের দিকে তাকিয়ে সে মহাবিশ্বের সীমানা দেখতে পেত, আর আজ সেখানে কেবল এক ‘প্রবেশ নিষেধ’ ফলক ঝুলছে।
শরিফুল মৃদুস্বরে বলল, “তুমি তো কোনোদিন ডাকোনি করবী। আজ কেন হঠাৎ?”
করবী জানালা দিয়ে বাইরের ট্রাফিক জ্যামের দিকে তাকিয়ে রইল। রাস্তার হলুদ বাতিগুলো তার চশমায় প্রতিফলিত হচ্ছে। সে ধীর গলায় উত্তর দিল, “মানুষ কি সবসময় প্রয়োজনে ডাকে? হয়তো শুধু দেখতে চেয়েছিলাম সময় তোমাকে কতটা বদলেছে। কিন্তু দেখছি, তুমি আজও সেই আগের মতোই বিভ্রান্ত।”
শরিফুলের মনে হলো, কেউ একজন তার হৃদয়ের অন্ধকার মহলে হানা দিয়েছে। এক গুপ্তচর, যে কোনো আইন মানে না। সে করবীর সেই মৃত নদীর চরে দাঁড়িয়ে আগুনের তৃষ্ণা খুঁজছে। সে জানে, এই দহন হিরন্ময়।
“আমি জানি করবী,” শরিফুল বলতে শুরু করল, তার গলার স্বর কিছুটা কাঁপছে, “তোমার হৃদয়ে আমার জন্য কোনো জলধারা নেই। ওটা এখন এক ধূ-ধূ মরুভূমি। কিন্তু জানো তো, কিছু দহনে কোনো ভস্ম থাকে না। আমি সেই আগুনটাই খুঁজছি যাতে পুড়লে কোনো চিহ্ন থাকে না।”
করবী এবার সরাসরি শিমুলের চোখের দিকে তাকাল। বিকেলের মরা আলোয় তার দৃষ্টিতে কি এক মুহূর্তের জন্য মায়ার আস্তরণ পড়ল? নাকি ওটা কেবলই বিভ্রম?
সে শান্ত গলায় বলল, “এই জেদ তোমাকে শেষ করে দেবে শরিফুল। আমার কাছে কোনো শীতলতা নেই। তুমি যে হিরন্ময় দহনের কথা বলছ, সেটা আসলে এক নিঃসঙ্গতার নাম।”
শরিফুল কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে জানে, এই পথ কোথাও মেশার নয়। ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে যখন সে ফুটপাতে পা রাখল, তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় শহরটাকে এক মায়াবী শ্মশানের মতো লাগছে। তার বুকের ভেতরে সেই ‘রিনিঝিনি’ শব্দটা বাজছে—তবে সেটা আনন্দের নয়, সেটা কাঁচ ভাঙার শব্দ। সে বুঝতে পারল, জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে এই দহনই তার একমাত্র প্রাপ্তি।




মতামত দিন-