সেদিন বিকেলের আকাশটা ছিল ঠিক যেন ফেটে যাওয়া কোনো ডালিমের মতো—লালচে, আর্দ্র আর বিষণ্ণ। ড্রয়িংরুমের কোণে বসে সাত বছরের রাইসা দেখছিল, তার অতি পরিচিত জগতটা কেমন করে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। বাতাসের শব্দে সেদিন কোনো গান ছিল না, ছিল কেবল বিদায়ের সুর। আলমারি থেকে যখন তার ছোট্ট জামাগুলো বের করে ব্যাগে ভরা হচ্ছিল, রাইসার মনে হলো প্রতিটি জামা যেন এক-একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে।
পাশের ঘরে নানি তখন ফোনে বিষ ঢালছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল ধারালো কোনো কাঁচের টুকরোর মতো, যা প্রতিটি শব্দে বাতাসকে ক্ষতবিক্ষত করছিল। “একদম ঠিক করেছিস রেখা! এমন শ্যাওলা ধরা পরিবারে থাকার চেয়ে একা থাকাও ভালো। ডিভোর্স পেপারটা তো কেবল কাগজ নয়, ওটা তোর মুক্তির সনদ!” রাইসা ধীরপায়ে নানির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন হাজার বছরের জমাট বাঁধা কুয়াশা। সে খুব মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “নানি, বাবা কি আজ আমাদের নিতে আসবে না?” নানি যেন এক টুকরো আগুনের দিকে তাকালেন, বললেন, “তোর ওই বাপের নাম আর মুখে নিবি না। ও আমাদের খানদানের যোগ্য নয়।”
রাইসার মা রেখা বেগম তখন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চোখের কোণে একফোঁটা জল চিকচিক করছিল বটে, কিন্তু জেদ নামক রাক্ষসটা তখন তাঁর সমস্ত মাতৃত্বকে আড়াল করে ফেলেছে। তিনি বুঝতে পারেননি, মায়ের ভুল পরামর্শ আর নিজের এক চিলতে অহংকার মিলে একটা আস্ত সাজানো বাগানকে মরুভূমি বানিয়ে দিচ্ছে।
নিঃশব্দ রাতের জোনাকি
তিন মাস কেটে গেছে। আদালতের সীল মোহর মারা কাগজগুলো এখন রেখা বেগমের ড্রয়ারে বন্দি। তিনি এখন ‘স্বাধীন’, কিন্তু এই স্বাধীনতার রঙ যে এত ধূসর হতে পারে, তা তাঁর জানা ছিল না। রাইসা এখন আর স্কুলে যেতে চায় না। তার বন্ধুরা যখন তাদের বাবার হাত ধরে পার্কে যাওয়ার গল্প করে, রাইসা তখন এক কোণে বসে নিজের নখ খুঁটে খুঁটে রক্ত বের করে ফেলে। নানি তাকে দামী খেলনা দেন, বিদেশি চকোলেটে ঘর ভরে ফেলেন, কিন্তু সেই সব উপঢৌকন রাইসার শূন্যতাকে আরও বেশি করে বিদ্রূপ করে।
এক গভীর রাতে রেখা বেগম লক্ষ্য করলেন, রাইসার ঘর থেকে এক অদ্ভুত সুগন্ধ বেরোচ্ছে। তিনি ভেতরে ঢুকে দেখলেন, রাইসা তার বাবার একটা পুরনো নীল শার্ট জড়িয়ে ধরে মেঝেতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। শার্টটি থেকে বেরোচ্ছে তার বাবার শরীরের সেই পরিচিত ঘ্রাণ—যা রাইসার কাছে পৃথিবীর সব আতরের চেয়ে দামী।
রেখা ডাকতেই রাইসা ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নাটা ছিল না কোনো শিশুর কান্নার মতো, বরং তা ছিল এক ভাঙা তারের বীণার বিলাপ। সে বলল, “মা, তোমরা তো যুদ্ধে জিতে গেছ। নানিও জিতেছে। কিন্তু আমি? আমার জগতটা কেন ধুয়ে মুছে গেল?” সেই রাতে রেখা প্রথমবার অনুভব করলেন, ইবলিশ হয়তো আড়ালে দাঁড়িয়ে তাঁর জেদকে অভিবাদন জানাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, কিছু কিছু বন্ধন ভাঙা যত সহজ, তার চেয়ে কোটি গুণ কঠিন সেই ভাঙা মনের হাহাকারকে সান্ত্বনা দেওয়া।
বিকেলের শেষ ছায়া
পরের শুক্রবার। পার্কের বেঞ্চগুলো তখন ক্লান্ত রোদে গা ভিজিয়ে বসে আছে। সাজিদ বসেছিলেন পার্কের এক কোণে, তার হাতে রাইসার জন্য আনা সেই ভাঙা পুতুলটা, যেটা একদিন তাদের সুখের সাক্ষী ছিল। মাসের এই একটা দিন তিনি যেন চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন রাইসার একটু স্পর্শের জন্য।
দূর থেকে রাইসাকে আসতে দেখেই সাজিদের বুকটা হাহাকারে ভরে উঠল। তার রাজকন্যার চোখের নিচের সেই কালচে দাগগুলো যেন হাজারটা অপ্রাপ্তির গল্প বলছে। রাইসা দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরতেই সাজিদের মনে হলো, তার সমস্ত আকাশটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
“বাবা, তুমি আর আমাদের বাসায় যাবে না?” রাইসার এই ছোট প্রশ্নে সাজিদের যাবতীয় পুরুষালি অহংকার বরফের মতো গলে জল হয়ে গেল। তিনি রেখার দিকে তাকালেন। রেখার মুখটাও আজ বড় ফ্যাকাশে, যেন এক শ্রাবণ শেষের মেঘ। সাজিদ অপরাধী স্বরে বললেন, “রেখা, সেদিন যদি তোমার মায়ের বিষাক্ত কথায় কান না দিয়ে আমরা নিজেরা একবার বুক খুলে কথা বলতাম, তবে আজ রাইসাকে এভাবে এতিমের মতো আমাদের হাত ধরতে হতো না।”
রেখা বেগম কেবল চোখ মুছলেন। বিকেলের সূর্য তখন বিদায়ের গান গাইছে। সূর্যটা ফুরিয়ে আসতেই রেখা রাইসার হাত ধরে টান দিলেন। রাইসা বারবার পিছন ফিরে তাকাতে তাকাতে মায়ের সাথে চলে গেল। সাজিদ একা বসে রইলেন সেই বেঞ্চে। তিনি দেখলেন, রাইসার রেখে যাওয়া চোখের জলগুলো যেন ঘাসের ওপর ছোট ছোট শিশিরবিন্দু হয়ে জমে আছে—যা রোদে শুকিয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু মাটির গভীরে রেখে যাবে এক অনন্ত তৃষ্ণা।
এ যুদ্ধে কেউই জেতেনি। রেখা জিতেছেন তাঁর ‘সম্মান’, সাজিদ পেয়েছেন তাঁর ‘মুক্তি’, আর নানি পেয়েছেন তাঁর ‘জেদ’। শুধু হেরে গেছে একটি শিশু, আর তার শৈশবের সেই নীল আকাশটা চিরতরে মেঘে ঢেকে গেছে।





মতামত দিন-