পরিচ্ছেদ ৫ঃ একটি ঝড়ের রাত
সেদিন রাতটা ছিল গুমোট। মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছিল দূর আকাশে, কিন্তু বাড়ির ভেতরে যে ঝড় বইছিল তার তীব্রতা ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও আরও অনেক বেশি।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে রাশেদ দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁর হাতে অফিসের কিছু ফাইল আর পরনে সাধারণ একটা পাঞ্জাবি। উল্টোদিকে হালিমা খাতুন সোফায় বসে ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপে। তিনি আজ চূড়ান্ত আক্রমণটি করেছেন—রাশেদের ব্যক্তিত্ব আর তাঁর বংশ পরিচয় নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ কিছু মন্তব্য করেছেন যা কোনো আত্মসম্মানী মানুষের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব।
“মরিয়ম, আমি তোমাকে শেষবার জিজ্ঞেস করছি,” রাশেদের কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত ভাবের পেছনে এক ভয়াবহ কম্পন ছিল। “তুমি কি তোমার মায়ের এই অপমানগুলোকেই সমর্থন করবে? আমি কি এই বাড়িতে একজন অনাহুত আগন্তুক?”
মরিয়ম কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। সে সোফার এক কোণে বসে ফুঁপাচ্ছিল। তাঁর কানে তখন মায়ের সেই মন্ত্র প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল— “মর্যাদাহীন মানুষের সাথে থাকলে তোর নিজেরও কোনো দাম থাকবে না।” সে শুধু বলল, “তুমি শান্ত হও রাশেদ। মা যা বলেছেন, রাগের মাথায় বলেছেন।”
“রাগের মাথায় নয় মরিয়ম, উনি যা বলেছেন তা পরিকল্পিত।” রাশেদ এবার হালিমা খাতুনের দিকে ফিরলেন। “আপনি আজ আমাকে আমার বাবার অভাব আর দারিদ্র্য নিয়ে খোটা দিয়েছেন। মনে রাখবেন, আমার বাবা দরিদ্র ছিলেন কিন্তু আপনার মতো অহংকারী ছিলেন না।”
হালিমা খাতুন বাঁকা হাসলেন। “সত্যি কথা তিতাই লাগে রাশেদ। আমার মেয়ের যোগ্য তুমি কোনোদিনই ছিলে না। যদি থাকতে, তবে আজ তোমাকে আমার করুণার ওপর নির্ভর করতে হতো না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। রাইসা তার ঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। সে দেখল, বাবা ধীর পায়ে তাঁর আলমারির দিকে গেল। একটা ছোট ব্যাগ বের করে তাতে কয়েকটা কাপড় আর রাইসার জন্য কেনা সেই জলরঙের সেটটা ঢোকাল।
“বাবা! তুমি কোথায় যাচ্ছো?” রাইসা ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে বাবার পাঞ্জাবিটা খামচে ধরল।
রাশেদ থমকে দাঁড়াল। তাঁর দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে রাইসাকে কোলে তুলে নিল এবং কপালে একটি দীর্ঘ চুমু খেল। রাইসা অনুভব করল বাবার চোখের জল তার গালে লেপ্টে যাচ্ছে।
“মা জননী,” রাশেদ ফিসফিস করে বলল, “আমি হেরে যাইনি মা। আমি শুধু আমার সম্মানটুকু বাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছি। তুমি বড় হও, তুমি বুঝবে।”
মরিয়ম এবার আর্তনাদ করে উঠলেন, “রাশেদ! তুমি এই রাতে রাইসাকে ফেলে চলে যাবে?”
রাশেদ দরজার কাছে গিয়ে একবার পেছন ফিরে তাকাল। মরিয়মের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি তো আমাকে আগেই ফেলে দিয়েছ মরিয়ম। তোমার মায়ের অহংকারের কাছে তুমি আমাদের ভালোবাসাকে বিক্রি করে দিয়েছ। যে বাড়িতে জামাইকে ভৃত্য ভাবা হয়, সে বাড়িতে রাইসার বাবা বাস করতে পারে না।”
রাশেদ বেরিয়ে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। বজ্রপাতের শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। রাইসা দরজার কাছে গিয়ে চিৎকার করে ডাকল, “বাবা! বাবা গো!”
কিন্তু বৃষ্টির ঝাপটায় বাবার অবয়বটা ধীরে ধীরে অন্ধকার রাস্তায় মিলিয়ে গেল। নানি হালিমা খাতুন তখন মরিয়মের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “যেতে দে ওকে। দেখবি দুদিন পর ঠিকই নাকে খত দিয়ে ফিরে আসবে। আমাদের টাকা আর ক্ষমতার কাছে ও নস্যি।”
কিন্তু ইবলিশ আড়ালে বসে জানত—রাশেদ আর ফিরবে না। একটি ঘর ভাঙল না শুধু, একটি শিশুর জগত আজ থেকে দুই ভাগ হয়ে গেল।
রাইসা ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে পড়ল। তার কানে বাবার সেই শেষ নিঃশ্বাসের শব্দ বাজছে। সে দেখল, বাইরের অন্ধকারে শুধু বৃষ্টি পড়ছে না, তার জীবনের সমস্ত আলো যেন নিভে গিয়ে এক দীর্ঘ অমাবস্যা নেমে এসেছে। মা পাশে এসে বসলেন, কিন্তু রাইসার মনে হলো এই নারী তার চেনা মা নন, ইনি একজন অপরিচিতা, যিনি তার বাবাকে রক্ষা করতে পারেননি।
জেতানোর নেশায় নানি-নানা আজ সত্যিই জিতে গেলেন। আর মাঝখানে একটি শিশু তার সমস্ত নিরাপত্তা হারিয়ে একা পড়ে রইল।





মতামত দিন-