পরিচ্ছেদ ৪ঃ দেয়ালের ওপাশে কান্না
বাড়ির বাতাস এখন ভারী সীসার মতো স্থির। আগে যে ঘরটা হাসি কলকাকলিতে মুখর থাকতো, সেখানে এখন শুধু থমথমে নীরবতা। রাইসা লক্ষ্য করেছে, এখন আর সকালে বাবা তাকে ঘুম থেকে জাগাতে আসেন না। মা-ও আগের মতো রান্নাঘরে গুনগুন করে গান গান না।
রাইসা তার ছোট ঘরের বিছানায় বসে ছিল। মেঝেতে তার প্রিয় পুতুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। একটা বড় চিনা পুতুল, যেটার নাম সে রেখেছিল ‘কুসুম’। সে কুসুমকে তার কোলের ওপর নিয়ে বসাল।
“জানিস কুসুম,” রাইসা ফিসফিস করে বলল, “মা আর বাবা বোধহয় এখন আর বন্ধু নেই। ওরা শুধু ঝগড়া করে।”
পাশের ঘর থেকে মরিয়মের গলার শব্দ ভেসে আসছিল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু সুরটা বেশ চড়া। নানি সেখানে উপস্থিত থেকে আগুনি বাষ্পে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন। হালিমা খাতুনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ শোনা গেল— “যে মানুষ তার স্ত্রীর মর্যাদা বোঝে না, তার সাথে এক ছাদের নিচে থাকাটাই পাপ।”
রাইসা তার দুই কান হাত দিয়ে চেপে ধরল। সে বড়দের এসব কথা শুনতে চায় না। সে চায় বাবা এসে তাকে বলবে, ‘চলো মা, ছাদে গিয়ে তারা দেখি’। কিন্তু বাবা এখন পড়ার ঘরে নিজেকে তালাবদ্ধ করে রাখেন। অফিস থেকে ফিরে তিনি আর রাইসাকে জড়িয়ে ধরেন না। তাঁর চোখের নিচে গভীর কালো দাগ পড়েছে।
মাঝরাতে রাইসার ঘুম ভেঙে গেল। পাশের ঘরে কোনো ঝগড়ার শব্দ নেই, কিন্তু এক ধরণের অদ্ভুত গুমোট কান্না শোনা যাচ্ছে। সে পা টিপে টিপে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, মা বিছানায় বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। আর বাবা জানালার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।
“মরিয়ম,” রাশেদের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত দুর্বল শোনাল, “তুমি কি সত্যিই চাও আমি তোমার মায়ের ব্যবসায়ে যোগ দিই? তুমি জানো আমি ওসব কুটিলতা বুঝি না।”
মরিয়ম কান্নার স্বরে বললেন, “আমি শুধু শান্তি চাই রাশেদ। মা প্রতিদিন আমাকে কথা শোনায়। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তুমি কেন একটু মানিয়ে নিতে পারো না?”
“মানিয়ে নেওয়া মানে তো নিজেকে হারিয়ে ফেলা মরিয়ম। তোমার মা আমাকে মানুষ হিসেবে নয়, তার আদেশের ভৃত্য হিসেবে দেখতে চান।”
রাইসা আর সহ্য করতে পারল না। সে দরজায় টোকা দিয়ে বলল, “মা, আমার ভয় করছে।”
মরিয়ম তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে রাইসাকে জড়িয়ে ধরলেন। “ভয় নেই মা, আমরা আছি তো। তুমি ঘুমাও।”
কিন্তু রাইসা দেখল বাবার চোখের জল। বাবা কাঁদছেন, অথচ বাবার তো কাঁদার কথা নয়! বাবা তো পাহাড়ের মতো শক্ত। রাইসা সেই রাতে আর ঘুমাতে পারল না। সে তার পুতুলের হাত ধরে অন্ধকারে বসে রইল। তার মনে হলো, ঘরের দেয়ালগুলো যেন ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসছে, তাকে পিষে ফেলতে চাইছে।
পরদিন সকালে রাইসা স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু তার টিফিন বক্সে আজ মা কোনো ভালোবাসা ভরে দেননি। নানি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে পরিচারিকাকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। মা ড্রয়িংরুমে বসে শূন্য দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
রাইসা স্কুলে গিয়েও কিছুতে মন দিয়ে ক্লাস করতে পারল না। ক্লাসে অংক করার সময় সে খাতার পাতায় বারবার একটা ছবি আঁকল—একটি বাড়ি, যা মাঝখান দিয়ে এক ফালি বজ্রপাতে ফেটে গেছে।
স্মৃতিরা সব ভিড় করছে রাইসার মনে। সেই দিনগুলোর স্মৃতি, যখন নানি ছিলেন না। যখন বাবা-মা হাত ধরে পার্কে হাঁটতেন। এখন যেন সবাই একেকটা দ্বীপে বাস করছে। মাঝখানে বিশাল সমুদ্র, যা কেউ পাড়ি দিতে পারছে না।
রাইসা বুঝতে পারল না, তার দোষ কী ছিল? কেন তাকে আজ এই নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকারে বসে থাকতে হচ্ছে? সে শুধু দেখল, ডাইনিং টেবিলের সেই একসময়কার প্রাণোচ্ছ্বল ‘হাসি’ এখন মৃত। আর ইবলিশ ড্রয়িংরুমের সেই অন্ধকার কোণ থেকে এখন জানালার বাইরে এসে হাসছে। অমাবস্যার ছায়াটা গাঢ় হতে শুরু করেছে।





মতামত দিন-