অভিশপ্ত অহংকার

অভিশপ্ত অহংকার।। তৃতীয় পর্ব

পরিচ্ছেদ ৩। আভিজাত্যের লড়াই

সকালের ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা আরও বেড়ে গেল। রাশেদ অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই হালিমা খাতুন সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে মরিয়মের সাথে আলাপ শুরু করলেন। আলাপের বিষয়বস্তু একটাই—স্ট্যাটাস বা সামাজিক অবস্থান।

“মরিয়ম, তোর আলমারিটা খুলে দেখলাম। ওসব কী ধরণের শাড়ি পরে আছিস তুই? আমাদের ওই দিকের মিসেস চৌধুরী কাল জিজ্ঞেস করছিল তোর কথা। আমি তো লজ্জায় বলতে পারিনি যে, আমার মেয়ে এখন সাধারণ তাতের শাড়ি পরে।” হালিমা খাতুনের প্রতিটি শব্দ যেন বিষ মাখানো তীরের মতো মরিয়মের কানে বিঁধছিল।

মরিয়ম মাথা নিচু করে বললেন, “মা, রাশেদ তো আমাকে অনেক শাড়ি কিনে দেয়। আর আমার এগুলোই পরতে আরাম লাগে।”

“আরাম!” হালিমা খাতুন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। “আরাম দিয়ে কি মান-সম্মান বাঁচে? তোর স্বামী তোকে একটা ভালো গয়না দিতে পেরেছে এই কয়েক বছরে? ওই তো একটা সোনার চেইন, যা আমি তোর বিয়ের সময় দিয়েছিলাম, ওটাই তোর সম্বল।”

রাশেদ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা অপমানে রি রি করে উঠল। সে ড্রয়িংরুমে ঢুকে শান্ত গলায় বলল, “মা, আমি যতটুকু পারি মরিয়মের জন্য সেরাটাই করার চেষ্টা করি। হয়তো আপনার মানদণ্ডে সেটা ছোট, কিন্তু এর ভেতর ভালোবাসা আছে।”

হালিমা খাতুন রাশেদকে দেখে একটুও অপ্রস্তুত হলেন না। বরং আরও জেদ নিয়ে বললেন, “ভালোবাসা দিয়ে কি চাল-ডাল কেনা যায় রাশেদ? মরিয়ম ছোটবেলা থেকে রাজকীয় হালে বড় হয়েছে। আর তুমি ওকে এই দুই কামরার ফ্ল্যাটে বন্দী করে রেখেছ। তোমার কি লজ্জা লাগে না?”

“মা!” মরিয়ম চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু হালিমা খাতুন থামলেন না।

“চুপ কর মরিয়ম। তোর ভালোর জন্যই বলছি। রাশেদ, তুমি যদি সত্যিই ওকে সুখী দেখতে চাও, তবে আমার কথা শোনো। আমার এক পরিচিত বড় ব্যবসায়ী আছে, তার কোম্পানিতে তুমি জয়েন করো। বেতন এখনকার চেয়ে তিনগুণ বেশি হবে। তখন অন্তত আমার মেয়েকে আর নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে থাকতে হবে না।”

রাশেদের আত্মসম্মানে বড় ধরণের চোট লাগল। সে কড়া গলায় বলল, “আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে চাকরি করছি মা। অন্যের করুণায় বড় হওয়ার শখ আমার নেই। আর আপনার যদি আমাদের এই ছোট ঘরে থাকতে কষ্ট হয়, তবে আপনি আপনার আলিশান বাড়িতে ফিরে যেতে পারেন।”

ঘরজুড়ে এক ভয়াবহ নীরবতা নেমে এল। হালিমা খাতুন রাগে থরথর করে কাঁপতে শুরু করলেন। তিনি মরিয়মের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখলি? দেখলি তোর স্বামীর স্পর্ধা? আমার মুখের ওপর কথা বলে! এই শিক্ষাই কি ও ওর পরিবার থেকে পেয়েছে?”

মরিয়ম তখন উভয় সংকটে। একদিকে গর্ভধারিণী মা, অন্যদিকে প্রাণপ্রিয় স্বামী। কিন্তু রাইসার নানির দীর্ঘদিনের মগজধোলাই আজ কাজ করতে শুরু করেছে। মরিয়ম রাশেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি মায়ের সাথে এভাবে কথা বলতে পারলে? উনি তো আমাদের ভালোর জন্যই বলছিলেন।”

রাশেদ অবাক হয়ে মরিয়মের দিকে তাকালেন। “তুমিও এ কথা বলছ মরিয়ম? তুমি জানো আমি কতটা কষ্ট করি এই সংসারটার জন্য।”

“কষ্ট তো সবাই করে রাশেদ, কিন্তু সার্থকতা কোথায়?” মরিয়মের কণ্ঠে আজ প্রথমবার এক ধরণের অতৃপ্তি ফুটে উঠল।

রাইসা তখন তার রুমের দরজার আড়াল থেকে এই দৃশ্য দেখছিল। তার হাতে সেই জলরঙের সেটটা, যেটা বাবা তাকে গত মাসে কিনে দিয়েছিল। সে দেখল, বাবার মুখটা ব্যথায় কুঁচকে গেছে। আর মায়ের চোখে এক ধরণের অপরিচিত কঠোরতা।

রাইসার মনে হলো, তার চিরচেনা বাবা-মা যেন একেকজন অচেনা যোদ্ধা হয়ে গেছেন। আর হালিমা খাতুন সেই যুদ্ধের সেনাপতি।

সেদিন বিকেলে রাইসা আর তার জলরঙ দিয়ে কোনো ছবি আঁকতে পারল না। সে দেখল, তার রঙদানিতে থাকা লাল রঙটা সাদা কাগজের ওপর পড়ে ছোপ ছোপ রক্তের মতো দেখাচ্ছে। আকাশটা তখন সত্যিই কালো হয়ে এসেছে, আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে বিচ্ছেদের এক করুণ সুর বাজতে শুরু করেছে।

ইবলিশ এবার আড়ালে বসে জোরে অট্টহাসি দিল। প্রথম বড় ফাটলটা তৈরি হয়ে গেছে।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.