পরিচ্ছেদ ২: মেঘের আনাগোনা
হালিমা খাতুন যখন ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন, তখন ঘরের বাতাস যেন ভারি হয়ে উঠল। সোফার কুশনগুলো ঠিকঠাক আছে কি না, বা কোণায় কোনো ধুলো জমেছে কি না—তা তিনি এমনভাবে পরখ করছিলেন যেন কোনো রাজকীয় পরিদর্শক এসেছেন।
“মরিয়ম, এই বাড়িতে কি এসি চলে না? উফ, কী ভ্যাপসা গরম!” বলেই তিনি হাতের দামী চামড়ার ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে মারলেন।
মরিয়ম ব্যস্ত হয়ে ফ্যান বাড়িয়ে দিলেন। “মা, তুমি আগে একটু বসো। পানি খাবে?”
রাশেদ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি সৌজন্যবোধ থেকে মৃদু হেসে বললেন, “মা, আপনি হঠাৎ? আগে তো কিছু জানাননি।”
হালিমা খাতুন রোদচশমাটা কপাল থেকে মাথার ওপর তুললেন। রাশেদের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে ঘরের আসবাবপত্রের দিকে চোখ বুলিয়ে বললেন, “জানিয়ে আসতে হবে কেন? নিজের মেয়ের বাড়িতে আসতেও কি এখন পারমিশন লাগবে? আর শোনো রাশেদ, তোমাদের এই এলাকাটা দিন দিন কেমন যেন ঘিঞ্জি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের গুলশানের বাড়িটা দেখো, কী শান্ত!”
রাশেদের হাসিটা কিছুটা ম্লান হলো। তিনি বুঝলেন, তাঁর ছোট কিন্তু পরিপাটি সংসারটাকে ছোট করা শুরু হয়ে গেছে। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “এখানকার মানুষগুলো ভালো মা, আর রাইসার স্কুলটাও খুব নিকটে।”
“স্কুল!” হালিমা খাতুন নাসিকা কুঞ্চিত করলেন। “কি অসাধারণ স্কুলে দিয়েছ মেয়েটাকে? আমাদের খানদানের ছেলেমেয়েরা যেখানে পড়ে, সেখানকার পরিবেশই আলাদা। মরিয়ম, তুমি ওকে বোঝাও না কেন?”
রাইসা তখন দরজার আড়াল থেকে দেখছিল। সে নানুকে ভয় পায়। নানুর গলার স্বর কেমন যেন ধারালো, কাঁচের ওপর পাথর ঘষলে যেমন শব্দ হয়। সে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে নিচু স্বরে বলল, “নানুভাই…”
হালিমা খাতুন রাইসাকে কাছে টেনে নিলেন। কিন্তু সেই কাছে টানার মধ্যে বাবার আদরের মতো উষ্ণতা নেই, আছে একধরণের কৃত্রিমতা। তিনি রাইসার জামাটা নেড়েচেড়ে দেখলেন। “ছিঃ মরিয়ম! মেয়েটাকে এই সাধারণ সুতির জামা পরিয়ে রেখেছ কেন? কতবার বলেছি ওকে একটু ব্রান্ডেড জামাকাপড় পরাবে। লোকে দেখলে বলবে কী?”
রাশেদ এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। “লোকেরা কী বলবে সেটা বড় কথা নয় মা, রাইসা সুতির পোশাকে আরাম পায়, এটাই আসল।”
হালিমা খাতুন এবার সরাসরি রাশেদের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে একধরণের অবজ্ঞা। “তুমি বুঝবে না রাশেদ। আভিজাত্য বা ক্লাস বিষয়টা জন্মগত। যে পরিবেশে তুমি বড় হয়েছ, সেখানে এসবের গুরুত্ব নেই। কিন্তু আমার নাতনিকে আমি এভাবে অবহেলায় বড় হতে দিতে পারি না।”
মরিয়ম পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইলেন। “মা, বাদ দাও তো এসব। তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো, আমি নাস্তা দিচ্ছি।”
রাশেদ কোনো কথা না বলে নিজের পড়ার ঘরে চলে গেলেন। রাইসা দেখল বাবার মুখটা থমথমে। সে বাবার পিছু পিছু যেতে চাইল, কিন্তু নানি তার হাত শক্ত করে ধরলেন। “কোথায় যাচ্ছো? এখানে বসো। আমার ব্যাগ থেকে তোমার জন্য দামী চকোলেট এনেছি, ওগুলো খাও। ওই রাস্তার ধারের আজেবাজে আইসক্রিম খাওয়ার অভ্যাস ছাড়ো এখন থেকে।”
রাইসা চকোলেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে সোফায় বসে রইল। তার মনে হলো, চকোলেটটা খুব দামী হতে পারে, কিন্তু খেতে কেমন যেন তিতকুটে।
সেদিন দুপুরে খাবার টেবিলে দীর্ঘ নীরবতা। শুধু চামচের সাথে কাঁচের প্লেটের ঠুংঠাং শব্দ শোনা যাচ্ছিল। হালিমা খাতুন খেতে খেতে প্রতিটি পদের খুঁত ধরছিলেন। মরিয়ম মাথা নিচু করে সব শুনছিলেন, আর রাশেদ একদৃষ্টিতে তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
রাইসা লক্ষ্য করল, জানালা দিয়ে আসা আকাশটা আর নীল নেই। সাদা মেঘগুলো ধীরে ধীরে ধূসর হতে শুরু করেছে। ডাইনিং রুমের সেই সকালের হাসিটা যেন কেউ একটা কাঁচের বয়ামে ভরে আটকে রেখেছে। বাইরে থেকে তা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু অনুভব করা যাচ্ছে না।
শুরু হলো এক দীর্ঘ শীতল যুদ্ধের সূচনা। ইবলিশ বোধহয় ড্রয়িংরুমের অন্ধকার কোণটায় বসে তার প্রথম চালটা দেখে মিটমিট করে হাসছিল।
প্রথম পর্ব পাঠ করতেএখানে ক্লিক করুন





মতামত দিন-