পরিচ্ছেদ ১ঃ সুপ্রভাতের শেষ হাসি
ভোরের নরম আলোটা যখন রাইসার ঘরের জানালার পর্দা ভেদ করে ভেতরে ঢোকে, তখন পৃথিবীটাকে তার কাছে একটা বিশাল রূপকথার গল্পের বই মনে হয়। সাত বছরের রাইসা তার বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে বাবা নিজ হাতে কতগুলো উজ্জ্বল তারা লাগিয়ে দিয়েছিলেন, যা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে।
“মা জননী, এখনও ঘুম ভাঙেনি?”
দরজার ওপাশে বাবার সেই গম্ভীর অথচ মায়াভরা কণ্ঠস্বর। রাইসা ঝটপট কম্বলের নিচে লুকিয়ে পড়ে। এটা তাদের রোজকার খেলা। বাবা ঘরে ঢুকবেন, তাকে খুঁজে না পাওয়ার ভান করবেন, আর রাইসা খিলখিল করে হেসে উঠে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
রাশেদ ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে এক মগ ধোঁয়া ওঠা চা আর রাইসার জন্য এক গ্লাস হালকা গরম দুধ। তিনি বিছানার পাশে বসে মিছামিছি বললেন, “আরে, আমার রাইসা মা-টা গেল কোথায়? আজ কি তবে সে স্কুলে যাবে না? আমি তো তার জন্য সেই লাল ফিতেওয়ালা জুতোজোড়া পালিশ করে রেখেছি।”
কম্বলের নিচ থেকে রাইসার হাসির শব্দ শোনা গেল। সে লাফিয়ে উঠে বাবার গলায় ঝুলে পড়ল। রাশেদ তাঁর একমাত্র কন্যাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। রাইসার নাকে বাবার গায়ের সেই চিরচেনা সুগন্ধ—দামী পারফিউম নয়, বরং একধরণের স্নিগ্ধ সাবান আর ঘামের মিশ্রণ, যা রাইসার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ঘ্রাণ।
“বাবা, আজ স্কুল থেকে ফেরার সময় আমাকে সেই বড় আইসক্রিমটা কিনে দেবে?” রাইসা আবদারের সুরে বলল।
রাশেদ মেয়ের নাকে একটা টোকা দিয়ে বললেন, “আগে দুধটা শেষ করো, তারপর দেখা যাবে। আর শোনো, আজ কিন্তু তোমার মা খুব ভোরে উঠে তোমার প্রিয় আলুর পরোটা বানিয়েছে। তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে এসো।”
রান্নাঘরে মরিয়ম ব্যস্ত। পরোটা বেলার শব্দ আর ভাজার সুগন্ধ সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে। রাইসা যখন দৌড়ে রান্নাঘরে গেল, মরিয়ম মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, “এত দৌড়াদৌড়ি করো না রাইসা, পড়ে যাবে তো! তোমার বাবার আদরে তুমি একদম মাথায় চড়েছ।”
মরিয়মের মুখে তখন এক অপূর্ব তৃপ্তি। স্বামী আর সন্তানকে নিয়ে এই ছোট সংসারটাই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। রাশেদ এসে মরিয়মের পাশে দাঁড়ালেন। আয়নার মতো ঝকঝকে রান্নাঘর, ডাইনিং টেবিলে সাজানো নাস্তা—সবকিছুতেই একটা পরিপাটি সুখের ছোঁয়া।
রাশেদ মরিয়মের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “জানো মরিয়ম, মাঝে মাঝে ভয় হয়। জীবনটা এত সুন্দর কেন? এত সুখ কি আমাদের সহ্য হবে?”
মরিয়ম হাসলেন। “কী যে আজেবাজে কথা বলো! আমাদের রাইসা আছে, আমাদের ভালোবাসা আছে। আর কী চাই?”
সেদিন সকালে রাইসা জানত না, এই হাসিটাই তার জীবনের শেষ নির্ভেজাল হাসি। ডাইনিং টেবিলের সেই কোলাহল, বাবার সেই শাসন আর মায়ের সেই যত্ন—সবকিছুর ওপর খুব দ্রুত একটা কালো মেঘের ছায়া ঘনিয়ে আসছে। রাইসা তার পুতুলটাকে নিয়ে খেলতে খেলতে ভাবছিল, পৃথিবীটা বুঝি এভাবেই চিরকাল রঙিন থাকবে।
কিন্তু বাড়ির বড় গেট দিয়ে তখন একটি সাদা গাড়ি ঢুকছে। যে গাড়িতে করে আসছেন রাইসার নানি, হালিমা খাতুন। তিনি শুধু একাই আসছেন না, সাথে করে নিয়ে আসছেন বংশীয় আভিজাত্যের এক বিষাক্ত বোঝা আর একরাশ অহংকার।
গাড়ির হর্নের শব্দে রাশেদের কপালের চামড়া কুঁচকে গেল। মরিয়মের হাতের খুন্তিটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। রাইসা জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে দেখল, তার নানুভাই নামছেন। নানুর পরনে দামী সিল্কের শাড়ি, চোখে রোদচশমা।
উঠোনের সেই হাসিমাখা সকালটা হঠাৎ করেই যেন কিছুটা থমকে গেল। শরতের আকাশে কালবৈশাখীর প্রথম মেঘটা উঁকি দিল।





মতামত দিন-