আজ আরিফের অফিস ছুটি। কিন্তু এই ছুটি তার জন্য শুধু এক বিষণ্ণতার চাদর নয়, বরং এক নিদারুণ শূন্যতার ভার। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, গতকাল মাগরিবের সালাতের পর সন্ধ্যা থেকেই যেন ভেতরে জমাট বাঁধা অন্ধকার সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে। সে সারাদিন বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে আছে, চোখের পাতা ভারি। বাইরের পৃথিবীতে এখন ঝিরঝির করে হেমন্তের এক পশলা বৃষ্টি নামার দারুন করুণ শব্দ। জানালার কাঁচে গড়িয়ে পড়া ও লেগে থাকা ফোটা ফোটা পানি আর ধূসর মেঘের দল তার ভেতরের অস্থিরতা, তার গোপন দীর্ঘশ্বাসকেই যেন আয়নায় প্রতিফলিত করছে।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যখন কাঁচের ওপর দিয়ে গড়িয়ে নামে, আরিফের মন তখন স্মৃতির গলিতে হেঁটে চলে—পা টিপে টিপে, খুব সন্তর্পণে। এই ভিন্ন শহরে, এই অচেনা কোণে, একা ঘরে, অসুস্থ শরীরে তার বারবার মনে পড়ে যায় সেই অদ্ভুত মানুষটাকে—উপজেলার পুরোনো মার্কেটের এক কোণে বসা, রহস্যময় শওকত হোসন ছকু– ওরফে ছকু হুজুর কে।
মহাজনদের মতো খাটিয়া বিছিয়ে বসে থাকত ছকু, পাশে ক্যাশ বাক্স। লোকমুখে রটেছিল, ছকু হাত দেখে ভাগ্য বলে দিতে পারে, ঝাড়-ফুঁকে তাবিজ-কবোজে কঠিন অসুখও সারে।
এক কৈশোরে বন্ধুদের সাথে আরিফ গিয়েছিল সেই দোকানে। ছকু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরিফকে দেখে ডেকেছিল, “অমুকের ছেলে না! ভেতরে আয়।” সেই ডাক যেন ছিল বহুদিনের পরিচিত কারোর। আরিফ ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিতেই ছকু তার হাতটা টেনে নিয়েছিল। শীতল আঙুলের স্পর্শ।
হাত দেখে ছকুর চোখ চকচক করে উঠেছিল। সে আরিফের চোখে চোখ রেখে প্রায় ফিসফিস করে বলেছিল, “তোমার ভাগ্য তো টাটার থেকেও দামি, এই ছেলে! একদিন তুমি বিশ্ববাজারে আলো ছড়াবে। আর তোমার কপালে ওই যে তিলটা, ওটা রাজটিকা—তোমার জন্মই হয়েছে শাসক হওয়ার জন্য!”
আজ তিন তলার বাসার বেডের নরম তোষকে শুয়ে আরিফ মৃদু হাসে। সে হাসি বেদনার, হতাশার, আর এক টুকরো অভিমানেরও। জীবন তাকে এনে ফেলেছে এমন এক ভিন্ন শহরে, এক অচেনা কোণে—যেখান থেকে ভারতের চেরাপুঞ্জির সবুজ পাহাড় দেখা যায়। বাসায় স্ত্রী সন্তান আছে, বাসার বাইরে আছে অনেক বন্ধু শুভাকাক্ষী অফিসে অনেক সহকর্মী কিন্তু তার পরেও যেন কিছু একটা নেই।
কোথায় গেল সেই টাটার মতো সৌভাগ্য? কোথায় সেই রাজটিকার ঝলক? সে তো সাধারণ এক কর্মী, এক ছাপোষা কেরানি মাত্র—ক্লান্ত আর কেবলই অসুস্থ। তার স্বপ্নের আকাশ আজ যেন ভেজা কাঁচের মতো ঝাপসা। একটা দীর্ঘশ্বাস তার হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা শৈশবের সেই বিশ্বাসটাকে জাগিয়ে তোলে—যে বিশ্বাস সমস্ত কোলাহলকে ছাপিয়ে যায়।
💔 “আমার কপাল তো টাটার থেকেও দামি…” ছকুর সেই কথাগুলো যেন এখন বিদ্রুপের মতো কানের কাছে বাজতে থাকে। এত প্রতিশ্রুতির পর এই তুচ্ছ জীবন! এই মুহূর্তে তার শরীরের প্রতিটি ব্যথা যেন সেই ব্যর্থ ভবিষ্যদ্বাণীর সাক্ষ্য দিচ্ছে। তার মনে হয়, কেউ যেন তার ভাগ্য নিয়ে নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে।
এই সময় তার হৃদয়ের গভীরে সেই পুরনো, অচঞ্চল বিশ্বাসটা জেগে ওঠে: ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত, মহান রব্বুল আলামীনের হাতেই তার লিখন শুরু ও শেষ। সে ছোট বেলায় বোখারী শরিফে এমন একটি হাদিস পড়েছিল, হুবহু মনে নেই তবে সারমর্ম মোটামুটি এরকম, “আল্লাহ্ মানুষের কপালে যা লিখে দিয়েছেন তার কালি শুকিয়ে গেছে, তা মুছতে চাইলেও কেহ মুছতে পারবে না।” ছোট বেলা থেকেই আরিফ অনেক বই পড়তো। বই পড়া যেন তার নেশা ছিল। আর বই পড়ার উৎসাহ যোগাতেন তার জান্নাতবাসি বাবা। আরিফের খুব মনে পড়ে ফজর নামাজের পর সে আর তার বাবা এই শরৎ ও হেমেন্তের সময় মাছ ধরতে যেত আগের দিন সন্ধায় পেতে রাখা চেরো (বাশের শলা দিয়ে তৈরী এক ধরনের মাছ ফাঁদ ) থেকে। চেরো গুলো আরিফের বাবা খুব স্বযত্নে তৈরী করতেন মাছ ধরার জন্য। আরিফের মন তখন এক গভীর যুক্তির জালে জড়িয়ে পড়ে—যদি ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত না হতো, তবে এই মহাজাগতিক ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকত?
সে ভাবতে শুরু করে সেই সৈৗদির মরুভূমিতে জন্মানো খোরমা খেজুরের কথা,
কোন এক ব্যক্তি অতি যত্নে বীজ বপন করল,
অন্য ব্যক্তি হয়ত রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করল,
কেই যত্ন করে ফল পাকালো,
কিছু লোক ফল প্যাকেজিং ও হাজার মাইল দূরে বাজারে বিক্রি করল,
যার হয়তো কোনো শ্রম নেই, সে বাজারের দোকান থেকে ফলটি কিনে খেল।
যে পরিশ্রম করল, সে পেল না। যে পেল, সে শ্রম করেনি। এই যে ফল খাওয়ার জন্য কেবল একজনই নির্দিষ্ট, এর কারণ কী? এই চরম বৈষম্যের পেছনে কি কোনো অদৃশ্য চিত্রনাট্য লেখা নেই? এই ভাবনা আরিফের ভেতরের শূন্যতাকে ভরে তোলে এক অপার শান্তিতে।
সে বুঝতে পারে, ছকুর ভবিষ্যদ্বাণী ভুল ছিল না, কিন্তু সেটির ব্যাখ্যা ভুল ছিল। তার রাজটিকা হয়তো ডলারে বা ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে নয়—তার রাজটিকা লুকিয়ে আছে এই শান্তিতে, এই উপলব্ধিতে যে, সে যা পাচ্ছে, তা তার জন্য নির্ধারিত। জীবনের পথে সে যা হারিয়েছে, তাতে হয়তো অন্য কারও জন্য নিয়ামত লুকানো ছিল। এই অসুস্থ শরীর, এই বিষণ্ণতা, এই একাকীত্ব—সবই এক বিশাল নকশার অংশ।
হঠাৎই বৃষ্টি থেমে আসে। জানালার কাঁচ পরিষ্কার হয়। মেঘেরা সরে যায়। প্রথম ঝলমলে রোদের রেখা এসে পড়ে তার চোখে।
আরিফ চোখ খোলে। তার মনে হয়, আজকের এই বিছানা, এই অসুস্থতা, এই ভিন্ন শহরের একাকীত্ব—এগুলোও হয়তো সেই পূর্বনির্ধারিত নকশার অংশ। আর এই আল্লাহর ইচ্ছার ওপর ভরসা রাখাটাই, এই শান্তির উপলব্ধিটুকুই, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য—এক অদৃশ্য রাজটিকা, যা পৃথিবীর কোনো সাম্রাজ্যের চেয়ে কম মূল্যবান নয়।💔






মন্তব্য করুন