shofiq.com
নাড়ীর বাঁধন

নাড়ীর বাঁধন

আরিফ যে ডেস্কে বসে আছে, তার মাথার উপর পুরোনো সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে ঘুরছে, ঠিক যেন ঘড়ির কাঁটার চেয়েও দ্রুত এক অস্থিরতা তার মনে অনুরণিত হচ্ছে। টেবিলে ছড়ানো ফাইলগুলো তার মনোযোগের বাইরে। তার চোখ বারবার দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার দিকে চলে যাচ্ছে—লাল কালিতে গোল করা একটা তারিখ: আগামী বৃহস্পতিবার। আজ বৃহস্পতিবার। মাঝে শুধু সাতটি দিন।

আরিফ কাজ করে এক সুদূর জেলায়, যেখানে তার আর মায়ের মাঝে প্রায় ৮০০ কিলোমিটারের ব্যবধান। এই দূরত্ব তাকে বছরে একবার বা দু’বারই মায়ের কাছে টেনে আনতে পারে। কিন্তু নাড়ীর বাঁধন কি দূরত্বের ফিতে দিয়ে মাপা যায়? তাদের বন্ধন দূরত্বের অঙ্কে নয়, হৃদয়ের অদৃশ্য, ইস্পাত-দৃঢ় সুতোয় বাঁধা। সেই সুতোয় টান পড়লেই আরিফের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

গত মাসখানেক ধরে মা আছেন ঢাকায়, ছোট ভাইয়ের বাসায়। অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা চলছে। মায়ের শেষ রক্তপরীক্ষার রিপোর্টগুলো আরিফের ওয়ালেটে সযত্নে রাখা, টাকার চেয়েও মূল্যবান। মাকে নিজের কাছে, তার নিজের হাতে গড়া ছোট সংসারে এনে রাখার জন্য আরিফ ট্রেনের টিকিট কেটেছে। মায়ের আসাটা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি যেন তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়, যেখানে মায়ের স্পর্শে আবার সবকিছু শুদ্ধ হয়ে উঠবে।

ঘড়ির কাঁটা একটু এগোলেই আরিফের মনে হয় যেন পাহাড় ডিঙোচ্ছে। এই সাতটা দিন, প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মিনিট, এমনকি প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক-একটা বছর। “আর মাত্র সাত দিন… ছয় দিন… পাঁচ দিন…” মনে মনে সে দিন গুনছে, আর প্রতিটা দিন যেন এক দুর্বিষহ প্রতীক্ষার নাম। তার অফিসের কফিটাও আজ কেন যেন তেতো লাগছে।

কিন্তু দূরত্ব বা প্রতীক্ষা কোনো কিছুই আরিফের রুটিন পাল্টাতে পারেনি। ঠিক দুপুরে খাবার আগে একবার, আর রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে একবার—এই তার প্রতিদিনের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম। সে জানে, এই খবর নেওয়াটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ইবাদত। তার কাছে জীবনের সমস্ত কাজ গৌণ, মায়ের খোঁজ নেওয়াটা সবার আগে।

এইমাত্র লাঞ্চ ব্রেক হয়েছে। পেটের খিদে নয়, আত্মার খিদে মেটাতে আরিফ টিফিন বক্স খুলল না। বরং ফোনটা তুলে দ্রুত ডায়াল করল। ওপাশ থেকে ভাইয়ের উদ্বিগ্ন কিন্তু চেনা গলা।

“হ্যালো, কী রে? মা কেমন আছে?”

“হ্যাঁ ভাই, ভালোই আছে। একটু আগে ভাত খেলেন। আর ওষুধটা আমি খাইয়ে দিয়েছি, ঠিক দশটায়।”

“ভাত খেলো? গরম ছিল তো? মাছের ঝোল ছিল? আর গোসল… ঠান্ডা লাগেনি তো?” আরিফের প্রশ্নে শুধু উদ্বেগ নয়, সন্তানের মতো এক কোমলতা ঝরে পড়ে।

“হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। তুমি চিন্তা কোরো না। মাকে কাল রাতে তোমার ভিডিও দেখিয়েছি, তুমি হাসছ দেখে মাও হাসছিলেন,” ভাই আশ্বস্ত করে।

আরিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই দীর্ঘশ্বাস শুধু ক্লান্তি বা স্বস্তি নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক চাপা ভয়। “জানিস, এই ক’টা দিন আমার কাটছে না। মনে হচ্ছে মা যদি কোনো কারণে ভুলে যায়, যদি সময়মতো ওষুধ না খায়… আমার যে কী হয়! মা-কে তো আমি শুধু ফোন দিয়েই ছুঁতে পারি…”

আসলে, আরিফের কাছে মায়ের খবর নেওয়াটা কেবল কর্তব্য নয়, এটা তার আত্মার খোরাক, তার জীবনের প্রধান উপাসনা। সে বিশ্বাস করে, জীবনে যত কাজই থাকুক, মায়ের খবর নেওয়াটা হলো শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে দিন সে কোনো কারণে খবর নিতে পারে না—হয়তো মিটিং-এ আটকে গেছে বা নেটওয়ার্ক নেই—সে দিন তার মনে হয় সে দিনের প্রধান ইবাদতটাই করা হয়নি, সে দিনটা যেন বৃথা গেল। তার পৃথিবীটা শূন্য মনে হয়, যেন তার ভেতরের আলো নিভে গেছে।

সে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আবার ফোন করল। এবার কথা হলো মায়ের সাথে। মায়ের দুর্বল কণ্ঠে সামান্য হাসি মেশানো।

“বাবা, এত চিন্তা করিস না। আমি ভালো আছি। আর তো কয়েকটা দিন। তোর কাছে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বউ মা’র হাতের আদা-চা আর সেদ্ধ ভাতে অনেক শান্তি,” মায়ের মৃদু কণ্ঠস্বর শুনে আরিফের হৃদয়ে এক শীতল, শান্তিদায়ী স্পর্শ নেমে আসে।

পরের দিন অফিসে, কাজের মাঝে যখনই আরিফের মন অস্থির হয়, মায়ের শরীরের সামান্য ব্যথা বা জ্বরের কথা মনে পড়ে, সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে বোঝায়, “আর মাত্র ৬ দিন। ৬ দিন, মানে ১২ বার ফোন করা। ১২ বার কথা বলা… ব্যস, তারপরেই মা চলে আসবে। আমার ইবাদত সম্পূর্ণ হবে।”

দূরত্ব হয়তো ৮০০ কিলোমিটার, কিন্তু আরিফের ইবাদতের বাঁধন সেই দূরত্বকে প্রতিদিন দুইবার করে শূন্যে নামিয়ে আনে। কারণ, তার ইবাদত দূরত্বে নয়, কেবল হৃদয়ের গভীর ভালোবাসায় বাঁধা। আর সেই ভালোবাসার টানে, সময় এখন তার কাছে কেবলই মায়ের আগমনী বার্তা বয়ে আনার এক মধুর প্রতীক্ষা

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

এই প্রকাশনাটির সর্বস্বত্ত লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। এই প্রকাশনার আংশিক বা সম্পুণাংশ অন্য যেকোন মিডিয়াতে লেখকের নামে ছাড়া অন্য কারও নামে প্রকাশ করা কপিরাইট আইন এ দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমুহ

    Recent Comments