shofiq.com
শান্ত ও স্নিগ্ধ খুশির ঢেউ

শান্ত ও স্নিগ্ধ খুশির ঢেউ

রিফের দিনটি আজ শুধু আনন্দের নয়, এ যেন সার্থকতার এক উৎসব। গত দেড় বছর ধরে তার হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা এক নিদারুণ প্রতীক্ষার বরফ গলতে শুরু করেছে। আর মাত্র দুই দিন পর— সেই শুভ মুহূর্তটি আসছে, যখন তার মা আসবেন! শত চেষ্টা, হাজারো জটিলতা, প্রতিবন্ধকতার ও ভৌগোলিক দূরত্বকে হার মানিয়ে অবশেষে ’মা’ কে কাছে পাওয়ার অপেক্ষায় আরিফের মন আজ বাঁধ মানছে না। এই তীব্র মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার পেশাগত জীবনের এক বিশাল জয়— বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত এইচ আর (হিউম্যান রিসোর্স) ডিপার্টমেন্টে বদলির চিঠি। এই চিঠি শুধু একটি দাপ্তরিক নির্দেশনা নয়, এটি আরিফের একনিষ্ঠ পরিশ্রম আর ধৈর্যের এক জীবন্ত দলিল।

আরিফের চোখ সবসময়ই ছিল এইচ আর পার্সোনাল হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। সে বিশ্বাস করত, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই একটি কোম্পানিতে চাকরি করতে করতেই সে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমবিএ শেষ করেছিল। কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে গিয়েছিল অন্য পথে— যেখানে তাকে শুরু করতে হয়েছিল মাঠ পর্যায়ে, অনেকটা নির্মাণ তত্ত্বাবধানের মতো কঠিন কাজে। এইচ আর-এর নরম আলোয় প্রবেশ তার জন্য ছিল দূর আকাশের তারার মতো। সেই তারা আজ ঝলমল করে তার হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিয়েছে। মায়ের আগমন আর স্বপ্নের পথে পদার্পণ— এই দ্বিগুণ প্রাপ্তি আরিফের হৃদয়কে এমনভাবে প্লাবিত করেছে, যেন তার ভেতরে বইছে আনন্দের এক অফুরন্ত স্রোত

স্মৃতির চিত্রপট তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আজ থেকে আড়াই-তিন বছর আগের সেই দিনগুলো, যখন সে প্রথম এই কোম্পানিতে যোগ দেয়। চারপাশে শুধু ধু-ধু প্রান্তর, যেন মরুভিূমির মত, কনস্ট্রাকশনের কাজ সবে শুরু। তখন এখানে শুধু কনস্ট্রাকশনের লেবার মিস্ত্রি ছাড়া ছিল না কোনো প্রাণ, ছিল না কোনো মানুষের কোলাহল, শুধু নির্জনতা। আরিফের মনে হতো, এ যেন এক স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন। শুধু ব্যস্ততাই তাকে উজ্জিবীত করে রাখত। কখনও সখনও যদি কাজ কম থাকতো তখন আরিফের ভালো লাগত না মন খারাপ হত, ফ্যামিলীর হথা মনে হত, মা এর কথা মনে হত। তখন তার মা কে ফ্যামিলকে ভিডিও কল দিত, ভিডিও কল দিলে তার ওয়াইফ বলত-”এই নির্জন জায়গায় থাকতে তোমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো?” আরিফ এড়িয়ে যেত কারন ও মনে মনে ভাবতো তাকে এই চ্যালেঞ্জ টা নিতেই হবে। যখন বেশী মন খারাপ হত তখন বাইক নিয়ে নদীর ধারে গিয়ে বাইকের উপর গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকতো।

শীতের কনকনে ঠাণ্ডা আর গ্রীষ্মের তপ্ত বালুকা ভেদ করে আরিফ এবং তার কয়েকজন সহকর্মী দিনরাত এক করে সেখানে ভিত গেঁথেছিলেন। ইটের পর ইট, ইস্পাতের পর ইস্পাত— তাদের তত্ত্বাবধানে দাঁড়িয়ে গেল বিশাল স্থাপনা। এরপর বিদেশ থেকে এলো অত্যাধুনিক মেশিনপত্র, একটি একটি করে তৈরি হলো আজকের এই স্বয়ংসম্পূর্ণ কারখানা। যেখানটায় একসময় ছিল শুধু নীরবতা, আজ সেখানে দেড়শ থেকে তিনশ মানুষের কর্মচাঞ্চল্য। আরিফের সেই প্রাথমিক শ্রম এবং ত্যাগের মূল্য কোম্পানি দিয়েছে তার সবচেয়ে পছন্দের জায়গায় বদলি করে, যা তার প্রতি প্রতিষ্ঠানের গভীর আস্থার প্রতীক

আরিফ আজ কেবল সফল নয়, সে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর জন্য সে কোম্পানির প্রতি যেমন কৃতজ্ঞ, ঠিক তেমনি কৃতজ্ঞ সেই সমস্ত সিনিয়রদের প্রতি, যারা নীরব সমর্থন এবং মূল্যবান উপদেশ দিয়ে তাকে এই পথে চালিত করেছেন। আর সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা জানায় সেই মহান সত্তা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি, যার কাছে সে প্রতিনিয়ত তার এই সরল চাওয়ার কথা নিবেদন করত— অশ্রুভেজা চোখে।

আরিফের চাওয়াগুলো চিরকালই ছিল অসামান্যভাবে সাধারণ। বিলাসবহুল জীবন, গাড়ি, বাড়ি বা বিদেশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন সে কখনও দেখেনি। একনকি অনেক নিকট আত্নীয় তাকে ইউরোপ তথা ইটালী আবার অনেকে সৈৗদিতে যাওয়ার অফার করেছে কিন্তু সে তাদের কে ভদ্রভাবে বুঝিয়ে সে অফার প্রত্যাক্ষান করেছে। প্রকৃতপক্ষে তার সব আকাঙ্ক্ষা ছিল একটিই— সৎ পথে থেকে, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শান্তিতে জীবন কাটানো এবং মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা। সে বিশ্বাস করত, টাকা পয়সা ইকাম নয়, মানুষের মন জয় করাই জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ, শ্রেষ্ঠ সুখ।

এই বিশ্বাস তার মধ্যে গেঁথে ছিল ছাত্রজীবন থেকেই। মাধ্যমিকের ছাত্র থাকাকালীন তার সরল কিন্তু গভীর উপলব্ধি ছিল: “যদি তোমাকে কেউ ভালো না বাসে, তবে সেটা তোমারই দোষ, কারণ তোমার মধ্যে এমন কিছু নেই যার কারণে মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে।” এই ধারণা তাকে অনুপ্রাণিত করত নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার জন্য। বড় হওয়ার পর বিভিন্ন জ্ঞানগর্ভ বইপত্র পড়ে সে শিখেছে— মানুষের মূল শক্তি হলো জ্ঞান, আর এই জ্ঞান আসে আল্লাহ তায়ালার নূর বা আলোক থেকে। তাই তার দৃঢ় বিশ্বাস— আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, কেবল তাদেরকেই সেই জ্ঞানের আলো দান করেন।

বই পড়া তার কাছে শুধু নেশা ছিল না, ছিল আত্মার খোরাক। আর এই নেশার প্রতি আশক্ত করেছিলেন তার বাবা। মূলত তার বাবাই তার আইডল, তার স্বপ্ন গড়ার কারিগর ছিলেন। তার বাবা প্রচুর বই পড়তেন এবং তাকে উৎসাহীত করতেন পড়ার জন্য। কারও কাছে নতুন কোনো বই দেখলেই আরিফ তা সংগ্রহ করত। লাইব্রেরিতে দুর্লভ বই খুঁজে না পেলে সে সরাসরি প্রকাশককে চিঠি লিখে ডাকযোগে বা কুরিয়ার মারফৎ তা আনিয়ে পড়ত। সেই জ্ঞানের প্রতি অবিচল তৃষ্ণাই তার ভেতরের মানুষকে আরও আলোকিত করেছে, তাকে ধৈর্যশীল করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত আজকের এই দ্বিগুণ আনন্দের সার্থক পরিণতি দিয়েছে।

আজকের এই দিনটি আরিফের কাছে এক নতুন দিগন্তের সূচনা। মা আসছেন, আর স্বপ্নপূরণ হয়েছে। এই দুটি প্রাপ্তি তার হৃদয়ে এমন এক শান্ত ও স্নিগ্ধ খুশির ঢেউ তুলেছে, যা তাকে আগামী দিনের পথে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

এই প্রকাশনাটির সর্বস্বত্ত লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। এই প্রকাশনার আংশিক বা সম্পুণাংশ অন্য যেকোন মিডিয়াতে লেখকের নামে ছাড়া অন্য কারও নামে প্রকাশ করা কপিরাইট আইন এ দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমুহ

    Recent Comments