কেন কুরআন জনে জনে নাযিল হয়নিঃ একটি মারেফতি বিশ্লেষণ

কেন কুরআন জনে জনে নাযিল হয়নিঃ একটি মারেফতি বিশ্লেষণ

অনাদি ও অনন্ত সত্তা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অসীম হেদায়েত বা পথপ্রদর্শনের ধারাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি সৃষ্টির আদি হতে নির্ধারিত এক পরম ঐশী প্রজ্ঞা বা ‘হিকমতে ইলাহী’। সৃষ্টির অন্ধকার অমানিশা ভেদ করে মানবাত্মাকে পরম সত্যের আলোকবর্তিকার দিকে ধাবিত করার লক্ষ্যে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি ব্যক্তিবিশেষে নির্দেশনা না পাঠিয়ে একজন ‘ইনসানে কামেল’ বা ‘পূর্ণাঙ্গ মানবে’র মাধ্যমে ওহী নাজিল করেছেন। এই পদ্ধতির মূলে নিহিত রয়েছে আল্লাহর সীমাহীন রহমত এবং মানুষের আধ্যাত্মিক সক্ষমতার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য।

ওহী কেবল একটি বাচনিক সংবাদ নয়, বরং এটি একটি ‘নূর’ বা পরম জ্যোতি। সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষের সীমাবদ্ধ চিত্ত সরাসরি সেই অলৌকিক জ্যোতির প্রচণ্ডতা সহ্য করতে অক্ষম। তাই মহান স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে এক পবিত্রতম ‘ওয়াসিলা’ বা মাধ্যমের প্রয়োজন ছিল, যিনি একইসাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর গ্রহণ করবেন এবং মানুষের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী তা বিতরণ করবেন।

হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পবিত্র আহলে বায়েত হলেন সেই ‘মিশকাত’ বা প্রদীপাধার, যাদের পবিত্র সত্তার মধ্য দিয়ে আল্লাহর কালাম জীবন্ত ও মূর্ত হয়ে উঠেছে। কেন আল্লাহ সরাসরি প্রতিটি আত্মাকে সতর্ক না প্রত্যেক ইনডিভিজুয়ালকে ওহী বা কালার প্রদান না করে রাসূলের পবিত্র অস্তিত্বকে সত্যের মাপকাঠি করলেন—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রবেশ করতে হয় মারেফাতের গহীন অরণ্যে, যেখানে যুক্তি ও প্রেমের মেলবন্ধনে উন্মোচিত হয় নবুয়ত ও বেলায়েতের প্রকৃত হাকিকত। বর্তমান প্রবন্ধে আহলে বায়েতের নূরে আলোকিত কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সেই রহস্যময় আধ্যাত্মিক যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

কেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে বা জনে জনে সরাসরি ওহী না পাঠিয়ে একজন ‘কামেল ইনসান’ বা রাসূলের মাধ্যমে হেদায়েত পাঠালেন, তা এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং গভীর বিষয়। নিচে কুরআন, হাদিস এর রেফারেন্সসহ মারেফাতের আলোকে একটি বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলোঃ

১। ওহীর ভার বহনে সক্ষমতা

মারেফাতের মূল তত্ত্ব হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নূর বা কালাম গ্রহণ করার জন্য একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক সক্ষমতার প্রয়োজন। প্রত্যেক সাধারণ মানুষ এই ভার সহ্য করতে পারে না।

কুরআনের দলিলঃ আল্লাহ বলেন,

لَوْ أَنزَلْنَا هَٰذَا الْقُرْآنَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ

“যদি আমি এই কুরআন কোনো পাহাড়ের ওপর নাজিল করতাম, তবে তুমি তাকে আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হতে দেখতে।” (সূরা হাশর: ২১)

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি বার্তা গ্রহণ করার জন্য যে আত্মিক পবিত্রতা প্রয়োজন, তা কেবল ‘মাসুম’ বা নিষ্পাপ আত্মারই থাকে। নবী (সা.) হলেন সেই পবিত্রতম আধার, যিনি ওই ‘তাজাল্লি’ বা জ্যোতি সহ্য করতে পারেন।

২। হাকিকতে মোহাম্মদী ও মধ্যস্থতা

মহান আল্লাহ এবং সৃষ্টির মাঝে একজন ‘ওয়াসিলা’ বা মাধ্যম থাকা অপরিহার্য। একে বলা হয় ‘হাকিকতে মোহাম্মদী’।

হাদিসে কুদসিঃ

لَوْلَاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ

“হে মোহাম্মদ! যদি আপনি না হতেন, তবে আমি আসমান ও মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতাম না।”

মারেফতি বিশ্লেষণঃ সূর্য থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ গ্রহণ করা সাধারণ বাল্বের পক্ষে সম্ভব নয়; এর জন্য ট্রান্সফরমার প্রয়োজন। ঠিক তেমনি, আল্লাহর অসীম নূর সরাসরি মানুষের সসীম অন্তরে প্রবেশ করলে তা ধ্বংস হয়ে যেত। নবী (সা.) এবং তাঁর আহলে বায়েত হলেন সেই আধ্যাত্মিক ট্রান্সফরমার, যারা ঐশী নূরকে মানুষের গ্রহণ উপযোগী করে বিতরণ করেন।

৩। ইনসানে কামেলবা জীবন্ত কুরআন

কেবল লিখিত কিতাব (কুরআন) যথেষ্ট নয়, যতক্ষণ না তার সাথে একজন ‘জীবন্ত কুরআন’ (নবী বা ইমাম) থাকেন।

হাদিসে সাকলাইন (সর্বজনস্বীকৃত):

إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمُ الثَّقَلَيْنِ: كِتَابَ اللَّهِ وَعِتْرَتِي أَهْلَ بَيْتِي

“আমি তোমাদের মাঝে দুটি মূল্যবান জিনিস রেখে যাচ্ছি: আল্লাহর কিতাব এবং আমার বংশধর আহলে বায়েত।”

মারেফাতঃ আল্লাহ যদি ব্যক্তিকে সরাসরি সতর্ক করতেন, তবে তা হতো কেবল শব্দ। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন একটি ‘উসওয়াহ’ বা আদর্শ। আহলে বায়েত শিখিয়েছেন যে, আল্লাহর উদ্দেশ্য কেবল তথ্য দেওয়া নয়, বরং মানুষকে তাঁর রঙে (صبغة الله) রাঙানো। আর মানুষ কেবল একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের (ইনসানে কামেল) সান্নিধ্যেই তা শিখতে পারে।

৪। মারেফতে নফস ও পরীক্ষার রহস্য

যদি আল্লাহ সরাসরি আসমান থেকে প্রতিটি ব্যক্তিকে নিষেধ করতেন, তবে মানুষের ‘ইখতিয়ার’ বা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির কোনো মূল্য থাকত না।

কুরআনের মূলনীতিঃ

لِيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَن بَيِّنَةٍ وَيَحْيَىٰ مَنْ حَيَّ عَن بَيِّنَةٍ

“…যাতে যে ধ্বংস হবে সে যেন সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই ধ্বংস হয় এবং যে জীবিত থাকবে সে যেন সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই জীবিত থাকে।” (সূরা আনফাল: ৪২)

ইমাম আলী (আ.) নাহজুল বালাগায় বলেছেন যে, আল্লাহ যদি ফেরেশতাদের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের শাসন করতেন, তবে মানুষ ভয়ে আনুগত্য করত। কিন্তু আল্লাহ চেয়েছেন মানুষ যেন সত্যের সন্ধান করে, নবীর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে এবং আপন অন্তরের নূর দিয়ে সত্যকে চিনে নেয়। এটিই হলো প্রকৃত হেদায়েত।

৫। সরাসরি নির্দেশের আধ্যাত্মিক ঝুঁকি

মারেফতের একটি সূক্ষ্ম দিক হলো, সরাসরি আল্লাহর আদেশ অমান্য করা অত্যন্ত ভয়াবহ।

যৌক্তিকতাঃ শয়তান সরাসরি আল্লাহর নির্দেশের অবাধ্য হয়েছিল বলেই সে চিরতরে অভিশপ্ত হয়েছে। কিন্তু নবীর মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর ফলে মানুষের জন্য তাওবা ও ক্ষমার পথ অনেক প্রশস্ত হয়েছে। আল্লাহ তাঁর পরম করুণায় একজন ‘বাশার’ বা মানুষকে পাঠিয়েছেন যাতে মানুষ তাঁর সাথে অন্তরঙ্গ হতে পারে।

হেদায়েতের এই পদ্ধতিটি আল্লাহর দুর্বলতা নয়, বরং এটিই তাঁর পরম করুণা (রহমত)। তিনি সরাসরি বার্তা না পাঠিয়ে একজন ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ (সা.)-কে পাঠিয়েছেন, যাতে মানুষ তাঁকে দেখে আল্লাহর মহব্বত শিখতে পারে।

মওলা আলী (আ.)-এর ভাষায়: “কুরআন একটি মৌন কিতাব, আর আমি (আলী) হলাম কথা বলা কুরআন।” সুতরাং, সরাসরি নির্দেশনা নয়, বরং একজন মহান ব্যক্তির পবিত্র জীবনের মধ্য দিয়ে সত্যকে প্রকাশ করাই হলো আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ রহস্য বা মারেফত।

পরিশেষে বলা যায়, আহলে বায়েতের (আ.) নূরের দর্শনে নবুয়ত ও রেসালাত কেবল একটি প্রশাসনিক পদ্ধতি নয়, বরং এটি খোদাপ্রাপ্তির একমাত্র রাজপথ। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি ব্যক্তির কাছে আলাদাভাবে সতর্কবার্তা না পাঠিয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র সত্তাকে কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছেন যাতে মানুষ ‘রব’ বা প্রভুকে চেনার আগে একজন ‘আবদ’ বা আদর্শ বান্দাকে চিনতে পারে।

সরাসরি ঐশী নির্দেশ না আসার পেছনে যে নিগূঢ় মারেফত কাজ করে, তা হলো মানুষের স্বাধীনতা ও প্রেমের পরীক্ষা। আল্লাহ চেয়েছেন বান্দা যেন তাঁর হাবিবের (সা.) সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সত্যের পথে আসে, কেবল দণ্ড বা শাস্তির ভয়ে নয়। আহলে বায়েত আমাদের শিখিয়েছেন যে, কুরআন একটি মহাসমুদ্র, আর রাসুল (সা.) ও তাঁর পবিত্র বংশধরগণ হলেন সেই সমুদ্রের পথপ্রদর্শক। মাধ্যম বা ‘ওয়াসিলা’ ছাড়া যেমন গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না, তেমনি রাসুলের আদর্শ ও আহলে বায়েতের মারেফত ছাড়া কুরআনের প্রকৃত নূর অন্তরে ধারণ করা সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই আল্লাহ মানুষের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, মানুষ যদি চায় তবে সে একজন কামেল ইনসানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয় একজন পেশাদার মানব সম্পদ কর্মকর্তা ও লেখক। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও মানবতার আর্তনাদ নিয়ে লেখালেখি করেন। তাঁর সৃজনশীল সত্তা সাহিত্য ও ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে জীবনবোধের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলে।

এই সাইটে প্রকাশিত সকল বিষয়বস্তু লেখকের নিজস্ব মেধাসম্পদ। লেখকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এই লেখার কোনো অংশ অন্য কোনো মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ বা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কপিরাইট আইনের পরিপন্থী।

মতামত দিন-

বিভাগ সমূহ

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

    Follow us

    Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.