প্রকৃতির রুদ্ররোষের মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম, যার কোনো পূর্বাভাস দেওয়া বর্তমান বিজ্ঞানেও সম্ভব নয়। আজ ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সংঘটিত ভূমিকম্পটি বাংলাদেশের মানুষের মনে, বিশেষ করে ঢাকাবাসীর মনে এক গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। যদিও রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল মাঝারি (৫.৭), কিন্তু এর উৎপত্তিস্থল ঢাকার অতি সন্নিকটে (নরসিংদী) হওয়ায় এটি আমাদের জন্য এক মহাবিপদ সংকেত বা ‘ওয়েক আপ কল’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ঢাকার মতো অপরিকল্পিত নগরীতে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা
ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট করে নরম মাটির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (Building Code) না মানার কারণে ঢাকা ভূমিকম্পের জন্য একটি টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে। একটি বড় মাত্রার (৭.০ বা তার বেশি) ভূমিকম্প হলে ঢাকার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা কল্পনা করাও কঠিনঃ
১. ভবন ধস ও ডোমিনো এফেক্টঃ ঢাকায় ভবনগুলো একটার সাথে আরেকটা প্রায় লেগে থাকে। ভূমিকম্পে একটি ভবন ধসলে তা পাশের ভবনের ওপর আছড়ে পড়বে, যা ‘ডোমিনো এফেক্ট’ তৈরি করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে।
২. উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়াঃ পুরান ঢাকা বা জনাকীর্ণ এলাকার গলিগুলো এত সরু যে, ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ি প্রবেশ করা অসম্ভব। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
৩. আগুন ও বিস্ফোরণঃ মাটির নিচ দিয়ে যাওয়া গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইনগুলো ভূমিকম্পে ফেটে গিয়ে পুরো এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে পারে।
৪. মাটি তরলীকরণ (Liquefaction)ঃ ঢাকার অনেক এলাকা ভরাট করা জমিতে গড়ে উঠেছে। তীব্র কম্পনে এই মাটি তরল হয়ে দেবে যেতে পারে, ফলে ভবনগুলো মাটিতে দেবে বা হেলে পড়বে।
২১ নভেম্বর ২০২৫: ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি
আজ ২১ নভেম্বর ২০২৫, সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীকে কেন্দ্র করে যে ভূমিকম্পটি হয়, তা রাজধানীসহ সারাদেশে অনুভূত হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এই দুর্যোগের চিত্র নিম্নরূপঃ
প্রাণহানিঃ ভূমিকম্পের সময় হুড়োহুড়ি, আতঙ্কে ছাদ থেকে লাফ দেওয়া এবং দেয়াল ধসে পড়ার ঘটনায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী মিলিয়ে অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
আহতঃ আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে এবং জানলার কাচ বা পলেস্তারা খসে পড়ে শতাধিক মানুষ আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
কাঠামোগত ক্ষতিঃ নরসিংদী ও ঢাকার কিছু পুরনো এবং দুর্বল ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি কিছু কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঢাকায় কয়েকটি ভবন হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে যা পরীক্ষার জন্য সিলগালা করা হয়েছে।
২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প: একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা
এই ভূমিকম্পটি আমাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, অতীতে বড় ভূমিকম্পগুলোর কেন্দ্র ছিল সিলেট, চট্টগ্রাম বা ভারতের সীমান্তে। কিন্তু গতকালের ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরে। এটি প্রমাণ করে যে, ঢাকার ঠিক নিচেই বা খুব কাছে সক্রিয় ‘ফল্ট লাইন’ বা ফাটল রয়েছে। ভূতত্ত্ববিদরা বহুদিন ধরে যে ‘মধুপুর ফল্ট’ নিয়ে সতর্ক করছিলেন, এই কম্পন সেই আশঙ্কাকেই প্রবল করল। এটি বড় কোনো দুর্যোগের ‘মহড়া’ হতে পারে।
ভূমিকম্পের আগে ও পরে আমাদের করণীয়
যেহেতু ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নেই, তাই প্রস্তুতিই একমাত্র বাঁচার উপায়।
১. ভূমিকম্পের আগে প্রস্তুতিঃ
বাড়ির প্রতিটি সদস্যের সাথে বসে ‘জরুরি পরিকল্পনা’ বা ইমার্জেন্সি প্ল্যান তৈরি করুন।
ঘরে একটি ‘ইমার্জেন্সি ব্যাগ’ প্রস্তুত রাখুন যাতে শুকনা খাবার, পানি, টর্চলাইট, ব্যাটারি, ফার্ষ্ট এইড কিট, বাঁশি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কপি থাকে।
ভারী আসবাবপত্র (আলমারি, বুকশেলফ) দেয়ালের সাথে শক্ত করে আটকে রাখুন।
২. ভূমিকম্প চলাকালীন (Drop, Cover, Hold on)ঃ
মাথা ঠান্ডা রাখুনঃ আতঙ্কে ছোটাছুটি করবেন না।
অবস্থানঃ ঘরের ভেতরে থাকলে শক্ত টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নিন। কাচের জানালা ও ভারী আসবাব থেকে দূরে থাকুন।
সিঁড়ি বা লিফট নয়ঃ কম্পন চলাকালীন কখনই সিঁড়ি বা লিফট ব্যবহার করবেন না।
বাইরে থাকলেঃ দালান, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছ থেকে দূরে খোলা জায়গায় অবস্থান নিন।
৩. ভূমিকম্পের পরেঃ
গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন পরীক্ষা করুন। লিক সন্দেহ হলে দিয়াশলাই বা লাইটার জ্বালাবেন না।
খালি পায়ে হাঁটবেন না।
আফটারশক (পরবর্তী ছোট কম্পন) এর জন্য প্রস্তুত থাকুন।
রেডিও বা নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে উদ্ধারকারী দলের নির্দেশনা শুনুন।
২১ নভেম্বর ২০২৫-এর ভূমিকম্পটি হয়তো ব্যাপক প্রাণহানি ঘটায়নি, কিন্তু এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমরা কতটা অরক্ষিত। ঢাকার মতো অপরিকল্পিত শহরে বড় ভূমিকম্প হলে যে মানবিক বিপর্যয় ঘটবে, তা সামাল দেওয়া এককভাবে সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার, ইমারত বিধিমালা মেনে ভবন তৈরি করার এবং পারিবারিকভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার। মনে রাখবেন, ভূমিকম্প মানুষ মারে না, মানুষ মারা যায় দুর্বল অবকাঠামো আর অসচেতনতার কারণে।
ছবিঃ প্রতিকি (এআই দ্বারা নির্মীত)






মন্তব্য করুন