খাদ্য হল আল্লাহ্র একটি বড় নেয়ামত। এই নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা শুধু একজন মুসলমানেরই নয়, প্রতিটি মানবিক মানুষের দায়িত্ব। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি সৈৗদির মত মুসলিম দেশগুলোতেও প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণে খাদ্য অপচয় করা হচ্ছে; সেটা আবার রমজান মাসে বেশী। বিবাহ অনুষ্ঠান, সামাজিক উৎসব, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা বাসাবাড়ির দৈনন্দিন রান্নায় এমনভাবে খাবার অপচয় হয়, যেন এ নেয়ামতের কোনও মূল্যই নেই।
ইসলাম ধর্ম খাদ্যকে শুধু দেহের জ্বালানি হিসেবে দেখেনি, বরং এটিকে একটি পবিত্র এবং সম্মানিত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য, কৃতজ্ঞতা, সংযম এবং দানের গুরুত্ব ইসলামে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
এই বইয়ে আমরা আলোচনা করব— কুরআন ও হাদীসের আলোকে খাদ্য অপচয় সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিকতা ও মানবিক বিবেচনা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনি অবস্থান এবং খাদ্য অপচয় রোধে সম্ভাব্য বাস্তবধর্মী উদ্যোগসমূহ।
১। কুরআনের আলোকে খাদ্য অপচয়
আল-কুরআনে আল্লাহ্ আমাদের খাদ্য গ্রহণে সংযমী হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন—
“তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:৩১)
এই আয়াতটি অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা বহন করে। এতে তিনটি মূল দিক উঠে আসে— ১. খাওয়া-পানার স্বাধীনতা আছে, ২. তবে সীমার মধ্যে থাকতে হবে, ৩. এবং অপচয় করলে তা আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে গণ্য হয়।
অপচয়কারীদের ব্যাপারে আরও কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে—
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার পালনকর্তার প্রতি অকৃতজ্ঞ ছিল।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৭)
অতএব, কুরআনের দৃষ্টিতে খাদ্য অপচয় শুধু দুনিয়াবী সমস্যা নয়; এটি একটি আধ্যাত্মিক ব্যর্থতা এবং ঈমানের দুর্বলতা প্রকাশ করে
২। হাদীসের আলোকে খাদ্যের মর্যাদা ও অপচয়
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও মিতব্যয়িতার শিক্ষা দিয়েছেন। খাদ্যের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন এবং কখনও খাদ্য অপচয় করতেন না।
একটি সহীহ হাদীসে এসেছে—
“তোমাদের কেউ যেন তার খাবার ফেলে না দেয়, কারণ সে জানে না কোন অংশে বরকত আছে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২০৩৪)
অর্থাৎ, প্লেটের শেষ অংশেও আল্লাহর বরকত থাকতে পারে। সুতরাং, সামান্য পরিমাণ খাবার হলেও তা অবহেলা করা উচিত নয়।
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে—
“নবী (সা.) তিন আঙ্গুল দিয়ে খেতেন এবং খাওয়ার পর সেই আঙ্গুল চেটে ফেলতেন।” (সহীহ মুসলিম)
এই আচরণগুলো শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস ছিল না, বরং খাদ্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ। আজকে আমরা দেখি— মানুষের থালায় থালায় অর্ধেক খাবার পড়ে থাকে, অতিথিদের দেখাতে গিয়ে খাবার বাড়িয়ে দেওয়া হয় অথচ তা শেষ করা হয় না। এধরনের কাজ ইসলামের চোখে নিন্দনীয়।
তাছাড়া রাসূল (সা.) বলেছেন—
“আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন, যে খাবার গ্রহণ করে এবং তারপর আল্লাহর প্রশংসা করে।” (তিরমিজি, হাদীস: ৩৩৮৫)
অতএব, একজন প্রকৃত মুসলমান খাবারের মর্যাদা রক্ষা করবে এবং তা শেষ করার চেষ্টা করবে। অপচয় করা মানে কেবল খাবার নষ্ট করা নয়— এটা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের অশ্রদ্ধাও।
৩। নৈতিকতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
খাদ্য অপচয় শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গোনাহ নয়— এটি একটি মারাত্মক মানবিক অপরাধও। যখন একপাশে হাজার হাজার টন খাবার ফেলা হয়, আর অন্যপাশে কোটি কোটি মানুষ অনাহারে থাকে, তখন এটা বৈষম্যের এক নির্মম চিত্র হয়ে দাঁড়ায়।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (WFP) জানায়, পৃথিবীতে প্রতি ৯ জনে ১ জন পর্যাপ্ত খাবার পায় না। অথচ আমরা বছরে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন টন খাবার অপচয় করি!
একটি বিবেচনা করা যাক— তুমি একদিকে অতিরিক্ত রান্না করে ফেলে দিচ্ছ, আর তোমার পাশের কোন শিশু রাতে না খেয়ে ঘুমোচ্ছে— এটা কি ন্যায়বিচার?
খাদ্য অপচয় মানবতার প্রতি একপ্রকার অবিচার। এটি দান, সদকা, ও সহানুভূতির পথ রুদ্ধ করে। ইসলাম শেখায়— অন্যের ক্ষুধা মেটাতে তুমি যদি নিজের সামান্য ত্যাগ করো, তবে সেটাই প্রকৃত মানবিকতা।
৪। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য অপচয়ের বিরুদ্ধে আইন ও নীতি
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই খাদ্য অপচয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে আইন ও কৌশল গ্রহণ করেছে।
১. ফ্রান্স:
২০১৬ সালে ফ্রান্স একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করে— যে কোনও বড় সুপারমার্কেট অবিক্রিত খাবার ফেলে দিতে পারবে না। তারা বাধ্য থাকবে এই খাবার স্থানীয় দাতব্য সংস্থা বা খাদ্য ব্যাংকে দান করতে। এই আইন লঙ্ঘন করলে জরিমানা হতে পারে প্রায় ৪,৫০০ ইউরো।
২. ইতালি:
ইতালি সরকার ব্যবসাগুলিকে উৎসাহিত করে, যেন তারা অতিরিক্ত খাবার দান করে। বিশেষ সুবিধা দিয়ে এই দানকে কর ছাড়ের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোও এতে আগ্রহী হচ্ছে।
৩. দক্ষিণ কোরিয়া:
সেখানে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় যা খাবার বর্জ্য ওজন করে এবং মানুষকে তার জন্য অতিরিক্ত কর দিতে হয়। “Pay-as-you-throw” নামে পরিচিত এই ব্যবস্থা মানুষকে অনেক সংযমী করেছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র:
যদিও যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ফেডারেল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক খাদ্য দান আইন নেই, কিন্তু অনেক অঙ্গরাজ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাবার দান করার ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা (Good Samaritan Act) দেওয়া হয়।
৫. সংযুক্ত আরব আমিরাত:
এদেশে বছরে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন টন খাবার অপচয় হয়। এই সমস্যা সমাধানে তারা “UAE Food Bank” প্রতিষ্ঠা করেছে। বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান মিলে খাবার সংগ্রহ ও বিতরণ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে? এখনো বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় নিয়ে সরাসরি কোনও আইন নেই। তবে বিভিন্ন নাগরিক উদ্যোগ, সামাজিক সচেতনতা এবং ইসলামী শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়ে এটা রোধ করা সম্ভব। আমাদের দেশে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা আশেপাশে দরিদ্র মানুষের জন্য অবিক্রিত বা অতিরিক্ত খাবার সংরক্ষণ ও বিতরণের কার্যক্রম শুরু করা খুবই জরুরি।
৫। খাদ্য অপচয় রোধে ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও বাস্তবধর্মী উদ্যোগ
খাদ্য অপচয় রোধে ইসলামী শিক্ষা ও সচেতনতা একান্ত অপরিহার্য। ইসলাম শুধু ধর্মীয় বিধান নয়— একটি পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। খাদ্য ব্যবস্থাপনায়ও ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
১. নিজে সংযমী হওয়া — ‘ইয়াওমুল হিসাব’ স্মরণে রাখা:
কুরআনে বলা হয়েছে—
“সেদিন তোমাদেরকে অবশ্যই প্রতিটি নেয়ামতের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে।” (সূরা তাকাসুর, ১০২:৮)
সুতরাং, আজ যে খাদ্য ফেলে দিচ্ছ, কাল কিয়ামতের ময়দানে তার হিসাব দিতে হবে। এই বিশ্বাস হৃদয়ে থাকলে খাদ্য নষ্ট করতে কারও মন চাইবে না।
২. খাবার গ্রহণে সুন্নতি পদ্ধতি অনুসরণ:
রাসূল (সা.) কখনও পেটভরে খেতেন না। তিনি বলতেন—
“তোমাদের কেউ যেন তার পেটকে খাবারের থলে না বানায়। এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য, আর এক-তৃতীয়াংশ নিঃশ্বাসের জন্য রেখো।” (তিরমিযি, হাদীস: ২৩৮০)
এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে অপচয় হবেই না, বরং স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে।
৩. অল্প রান্না ও পরিমিত পরিবেশন:
অনেক সময় আমরা অতিথি আপ্যায়নে অতিরিক্ত রান্না করি এবং সেখান থেকেই শুরু হয় অপচয়। বরং, ইসলাম বলে— “যা আছে, তাতেই তুষ্ট হও”।
অতিথিকে সম্মান জানাতে প্রচুর খাবার লাগবে না, বরং আন্তরিকতা ও শিষ্টাচারই যথেষ্ট।
৪. সামাজিক উদ্যোগ ও খাদ্য ব্যাংক গঠন:
খাবার অপচয় রোধে সমাজে কিছু উদ্যোগ নেওয়া যায়—
রেস্টুরেন্ট বা হোটেলগুলোর বেঁচে যাওয়া খাবার আশেপাশের গরিবদের মাঝে বিতরণ।
বিয়ে বা দাওয়াতে বাড়তি খাবার সংগ্রহ করে এতিমখানায় পৌঁছে দেওয়া।
মসজিদ বা মাদ্রাসার তরুণদের নিয়ে “খাদ্য রক্ষা সংঘ” গঠন করা।
৫. শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি:
খাদ্যের মূল্য ও অপচয় বিরোধী শিক্ষা শিশুদের প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখানো উচিত। স্কুলের পাঠ্যবইয়েও থাকা উচিত— “খাবার শেষ করো, অপচয় নয়” এই বার্তা।
খাদ্য অপচয় একটি ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক সমস্যা। এই অপচয় বন্ধ হলে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টিই অর্জিত হবে না, বরং দুনিয়ার লাখো ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব হবে। আসুন, আমরা সকলে মিলে খাদ্য অপচয় রোধে অঙ্গীকারবদ্ধ হই— নিজে বাঁচি, অন্যকে বাঁচাই।
মন্তব্য করুন