shofiq.com
কুরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহ্‌র পরিচয় এবং কেন আমরা তাঁর আনুগত্য করব

কুরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহ্‌র পরিচয় এবং কেন আমরা তাঁর আনুগত্য করব

ইসলামের দুটি মৌলিক প্রশ্ন হলো: আল্লাহ্‌ কে এবং আমরা কেন তাঁর উপাসনা বা আনুগত্য করব? এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট এবং সন্তোষজনক উত্তর ইসলাম মানবজাতিকে দিয়েছে। নিচে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

প্রথম পর্ব: আল্লাহ্‌র পরিচয়

ইসলামে আল্লাহ্‌র পরিচয় অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তিনি কোনো অস্পষ্ট বা রহস্যময় সত্তা নন। কুরআন এবং হাদিসে তাঁর পরিচয় ও গুণাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

১. তাওহীদ বা একত্ববাদ: আল্লাহ্‌র পরিচয়ের মূল ভিত্তি

ইসলামের প্রধান স্তম্ভ হলো ‘তাওহীদ’, যার অর্থ হলো আল্লাহ্‌র একত্ববাদ। আল্লাহ্‌ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার, সমকক্ষ, পিতা, পুত্র বা কোনো প্রকার আত্মীয় নেই। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইখলাস এই ধারণাকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরে, যাকে ‘আল্লাহ্‌র পরিচয়পত্র’ বলা হয়:

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ

অর্থ:

বলুন, তিনি আল্লাহ্‌, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ্‌ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। এবং তাঁর সমকক্ষ আর কেউই নেই। (সূরা আল-ইখলাস, ১১২:১-৪)

এই সূরাটি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে, আল্লাহ্‌ তাঁর সত্তা ও গুণে অদ্বিতীয়।

২. আল্লাহ্‌র গুণাবলী (আসমাউল হুসনা)

আল্লাহ্‌ নিজেকে তাঁর সুন্দর নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে, “আর আল্লাহ্‌র জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সেই সব নামেই ডাকো।” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:১৮০)। এই গুণগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে তিনি কেমন। কিছু প্রধান গুণাবলী হলো:

  • আর-রাহমান (الرَّحْمٰنُ), আর-রাহীম (الرَّحِيْمُ): তিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু। তাঁর দয়া ও করুণা তাঁর ক্রোধের চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিটি ভালো কাজ তাঁর নামে শুরু করার শিক্ষা এটাই প্রমাণ করে।
  • আল-খালিক (الْخَالِقُ): তিনি সৃষ্টিকর্তা। তিনি মহাবিশ্বের সবকিছু, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং একাই সবকিছু পরিচালনা করেন।
  • আর-রব (الرَّبُّ): তিনি প্রভু, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা। তিনি শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি, বরং প্রতি মুহূর্তে সমস্ত সৃষ্টির প্রয়োজন পূরণ করছেন এবং তাদের প্রতিপালন করছেন।
  • আল-আলীম (الْعَلِيْمُ), আল-হাকীম (الْحَكِيْمُ): তিনি সর্বজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়। তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে। কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয় এবং তাঁর প্রতিটি কাজ ও বিধান পরিপূর্ণ প্রজ্ঞায় ভরা।
  • আস-সামী (السَّمِيعُ), আল-বাসীর (الْبَصِيْرُ): তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। তিনি প্রতিটি শব্দ শোনেন, এমনকি মনের গোপন কথাও। তিনি সবকিছু দেখেন, রাতের অন্ধকারে কালো পাথরের উপর কালো পিঁপড়ের চলাচলও তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়।

কুরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত হিসেবে পরিচিত আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহ্‌র পরিচয় ও ক্ষমতা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে:

“আল্লাহ্‌! তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবকিছু তাঁরই। কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে, তিনি তা জানেন। তাঁর জ্ঞান থেকে কোনো কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না, কেবল যতোটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসি (সিংহাসন) আকাশ ও পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করে আছে। আর এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সর্বোচ্চ এবং সর্বমহান।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৫)

৩. তিনি সৃষ্টির ঊর্ধ্বে

আল্লাহ্‌ তাঁর কোনো সৃষ্টির মতো নন। মানুষের কল্পনা বা চিন্তা তাঁকে ধারণ করতে অক্ষম। তিনি আকার, আকৃতি, স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। কুরআন স্পষ্টভাবে বলে:

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ “তাঁর মতো কোনো কিছুই নেই।” (সূরা আশ-শূরা, ৪২:১১)

দ্বিতীয় পর্ব: আমরা কেন আল্লাহ্‌কে মানবো?

আল্লাহ্‌র পরিচয় জানার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, আমরা কেন তাঁর আনুগত্য করব? এর কারণগুলো যৌক্তিক এবং মানুষের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

১. কারণ তিনি আমাদের স্রষ্টা ও পালনকর্তা

সবচেয়ে বড় কারণ হলো, তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আমাদের জীবন, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিস—বাতাস, পানি, খাদ্য—সবই তাঁর দান। যে সত্তা আমাদের অস্তিত্ব দিয়েছেন এবং প্রতি মুহূর্তে আমাদের লালন-পালন করছেন, বিবেক ও কৃতজ্ঞতার দাবি হলো তাঁর প্রতি অনুগত থাকা। এটি কোনো জোর বা জবরদস্তি নয়, বরং স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির স্বাভাবিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার প্রকাশ।

২. জীবনের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য

আল্লাহ্‌ মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। তিনি আমাদের একটি মহান উদ্দেশ্য দিয়ে পাঠিয়েছেন। কুরআন বলে:

“আমি জিন ও মানুষকে আমার ইবাদত (উপাসনা ও আনুগত্য) করা ছাড়া অন্য কোনো কারণে সৃষ্টি করিনি।” (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬)

এখানে ‘ইবাদত’ শুধু নামায, রোযা, হজ্জ বা যাকাতের মতো আনুষ্ঠানিক উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র আদেশ-নিষেধ মেনে চলাই ইবাদত। সৎ পথে ব্যবসা করা, পিতা-মাতার সেবা করা, সত্য কথা বলা, জ্ঞান অর্জন করা, মানুষের উপকার করা—এই সবই ইবাদত যদি তা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করার জন্য করা হয়। আল্লাহ্‌কে মানার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারি।

৩. সঠিক পথনির্দেশ ও সাফল্যের জন্য

মানুষ হিসেবে আমাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, কিসে প্রকৃত সাফল্য আর কিসে ব্যর্থতা—তা আমরা নিজেরা পুরোপুরি নির্ধারণ করতে পারি না। তাই পরম দয়ালু আল্লাহ্‌ আমাদের একা ছেড়ে দেননি। তিনি যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং আসমানি কিতাব (যেমন: কুরআন) নাযিল করেছেন আমাদের পথ দেখানোর জন্য। এই পথনির্দেশনা অনুসরণ করলে আমরা দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনেই সফলতা ও শান্তি লাভ করতে পারব।

৪. জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের জন্য

ইসলাম আমাদের শেখায় যে এই জীবনই শেষ নয়। মৃত্যুর পর আমাদের সবাইকে আল্লাহ্‌র সামনে দাঁড়াতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে। যারা আল্লাহ্‌র নির্দেশ মেনে চলবে, তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার তথা চিরস্থায়ী শান্তির জান্নাত। আর যারা তাঁর অবাধ্য হবে, তাদের জন্য রয়েছে শাস্তি তথা জাহান্নাম। এই জবাবদিহিতার ভয় মানুষকে অন্যায়, অবিচার ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং একটি নৈতিক ও সুন্দর সমাজ গঠনে সাহায্য করে।

৫. আত্মিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য

মানুষের আত্মা সব সময় এক আশ্রয় খুঁজে বেড়ায়। দুনিয়ার কোনো সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতি আত্মাকে পূর্ণ প্রশান্তি দিতে পারে না। প্রকৃত ও চিরস্থায়ী শান্তি কেবল আল্লাহ্‌র স্মরণ ও তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণের মধ্যেই নিহিত। কুরআন বলে:

“জেনে রাখো, আল্লাহ্‌র স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আর-রা’দ, ১৩:২৮)

যখন একজন মানুষ তার মহান প্রভুর সামনে মাথা নত করে, তখন সে সব ধরনের ভয়, হতাশা ও উদ্বেগ থেকে মুক্তি পায় এবং এক অনাবিল প্রশান্তি অনুভব করে।

উপসংহার

আল্লাহ্‌ হলেন এক, অদ্বিতীয়, পরম করুণাময় স্রষ্টা ও পালনকর্তা। তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সকল গুণের আধার। আমরা তাঁর আনুগত্য করি কারণ তিনিই আমাদের অস্তিত্বের উৎস, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য তাঁরই ইবাদত করা, তাঁর দেখানো পথেই রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা এবং তাঁর স্মরণের মধ্যেই রয়েছে আত্মার চিরন্তন শান্তি। এই আনুগত্য কোনো বোঝা নয়, বরং স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসের এক সুন্দর প্রতিফলন।

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়

এই প্রকাশনাটির সর্বস্বত্ত লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। এই প্রকাশনার আংশিক বা সম্পুণাংশ অন্য যেকোন মিডিয়াতে লেখকের নামে ছাড়া অন্য কারও নামে প্রকাশ করা কপিরাইট আইন এ দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।...

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমুহ

    Recent Comments