কুরআন শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং এটি এমন এক অলৌকিক বাণী যা যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি মানুষকে মুগ্ধ করেছে। আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো নাম ছিল না, তখন একজন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করা ব্যক্তির (মুহাম্মদ সা. স্বয়ং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতালার নিকট থেকে জীবরাইলের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করেন) মুখ থেকে এমন এক কিতাব নিঃসৃত হলো, যার প্রতিটি আয়াত গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় ভরপুর। বিজ্ঞান ও যুক্তির নিরিখে কুরআনের অলৌকিকতা অন্বেষণ করলে এর ঐশ্বরিক উৎস সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
কুরআনের ভাষাগত ও সাহিত্যিক অলৌকিকতা
কুরআনের প্রথম এবং প্রধান অলৌকিকতা হলো এর ভাষা ও সাহিত্যিক মান। আরবের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কবি ও সাহিত্যিকরা কুরআনের ভাষার অতুলনীয় সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছিলেন। এর বাক্য গঠন, শব্দচয়ন, অলঙ্কার এবং ছন্দের এমন এক ঐশ্বরিক সমন্বয় ছিল যে, কেউ এর মোকাবিলা করতে পারেনি। আল্লাহ তায়ালা নিজেই চ্যালেঞ্জ করেছেন:
وَإِن كُنتُمْ فِى رَيْبٍۢ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا۟ بِسُورَةٍۢ مِّن مِّثْلِهِۦ وَٱدْعُوا۟ شُهَدَآءَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمْ صَـٰدِقِينَ ٢٣
“আর যদি তোমরা সে বিষয়ে সন্দেহে থাক যা আমি আমার বান্দার উপর নাযিল করেছি, তাহলে এর মতো একটি সূরা নিয়ে আসো এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” (সূরা বাকারা: ২৩)
এই চ্যালেঞ্জ আজও অমীমাংসিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে আরবের শ্রেষ্ঠ কবিরা শত চেষ্টা করেও কুরআনের মতো একটি ছোট সূরা তৈরি করতে পারেননি। এটি প্রমাণ করে যে, এই ভাষার উৎস কোনো মানবীয় সত্তা নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা।
বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোকে কুরআনের অলৌকিকতা
আধুনিক বিজ্ঞান অনেক তথ্য উদ্ঘাটন করেছে, যা কুরআন ১৪০০ বছর আগেই বর্ণনা করেছে। তৎকালীন সময়ে এই তথ্যগুলো মানুষের ধারণার বাইরে ছিল।
১. মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ
কুরআন মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্বের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
* বিগ ব্যাং সাদৃশ্য: আল্লাহ তায়ালা বলেন:
أَوَلَمْ يَرَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓا۟ أَنَّ ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًۭا فَفَتَقْنَـٰهُمَا ۖ وَجَعَلْنَا مِنَ ٱلْمَآءِ كُلَّ شَىْءٍ حَىٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ ٣٠
“যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম?” (সূরা আম্বিয়া: ৩০)
এই আয়াতটি মহাবিশ্বের আদি অবস্থা এবং তার পরবর্তী বিচ্ছুরণের ইঙ্গিত দেয়, যা বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূল ধারণা।
* মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ: কুরআন আরও বলে:
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ
“আর আসমান, আমি তাকে নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং নিশ্চয়ই আমি তাকে সম্প্রসারিত করছি।” (সূরা আয-যারিয়াত: ৪৭)
১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বিষয়টি প্রমাণ করেন, যা এই আয়াতের সাথে হুবহু মিলে যায়। ১৪০০ বছর আগে একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষে এই বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা অসম্ভব ছিল।
২. মানব ভ্রূণের বিকাশ
কুরআন মানব ভ্রূণের বিকাশের এমন সব পর্যায় অত্যন্ত নির্ভুলভাবে বর্ণনা করেছে, যা আধুনিক এমব্রায়োলজি (ভ্রূণবিদ্যা) ছাড়া জানা সম্ভব নয়।
* সৃষ্টির পর্যায়ক্রম: আল্লাহ তায়ালা বলেন:
خَلَقَ الْإِنسَانَ مِن نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ
“আমি মানুষকে এক ফোঁটা বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর সে (পর্যায়ক্রমে) সুবিন্যস্ত মানুষ হয়ে গেছে।” (সূরা নাহল: ৪)
কুরআনে ভ্রূণের ‘নুৎফা’ (শুক্রবিন্দু), ‘আলাকা’ (রক্তপিণ্ড বা ঝুলে থাকা জিনিস), ‘মুদগাহ’ (একখণ্ড মাংসপিণ্ড) থেকে অস্থি ও মাংস গঠনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ
ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ
ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ ۚ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
“নিশ্চয় আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক নিরাপদ স্থানে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তপিণ্ডে পরিণত করেছি, অতঃপর জমাট রক্তপিণ্ডকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি, এরপর মাংসপিণ্ডকে অস্থিপঞ্জরে রূপান্তরিত করেছি, অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি। সবশেষে আমি তাকে এক ভিন্ন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি। সুতরাং সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!” (সূরা মুমিনূন: ১২-১৪)
আধুনিক বিজ্ঞান ডিএনএ, ক্রোমোজোম এবং মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পর এই তথ্যগুলো জানতে পেরেছে। এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, কুরআনের জ্ঞান মানবীয় নয়, বরং ঐশ্বরিক।
৩. পানিচক্র ও বৃষ্টির সৃষ্টি
কুরআন পানিচক্রের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে, যা আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল সাইকেলের ধারণার সাথে মিলে যায়।
* বৃষ্টির প্রক্রিয়া: আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَهُوَ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ ۖ حَتَّىٰ إِذَا أَقَلَّتْ سَحَابًا ثِقَالًا سُقْنَاهُ لِبَلَدٍ مَّيِّتٍ فَأَنزَلْنَا بِهِ الْمَاءَ فَأَخْرَجْنَا بِهِ مِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ ۚ كَذَٰلِكَ نُخْرِجُ الْمَوْتَىٰ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
“আর তিনিই সেই সত্তা, যিনি বাতাস পাঠান সুসংবাদস্বরূপ তাঁর রহমতের আগে। এমনকি যখন তা ভারী মেঘমালা বয়ে নিয়ে আসে, তখন আমি তা মৃত ভূমির দিকে চালিত করি, অতঃপর তা দ্বারা পানি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা সব ধরনের ফল উৎপন্ন করি।” (সূরা আরাফ: ৫৭)
এই আয়াতগুলো বায়ুর মাধ্যমে মেঘমালা গঠন এবং বৃষ্টির মাধ্যমে ভূমিতে জীবনের সঞ্চার হওয়ার প্রক্রিয়াকে সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করে।
৪. সমুদ্রের অলৌকিকতা
কুরআন সমুদ্রের গভীরে থাকা বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছে, যা আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া জানা সম্ভব ছিল না।
* দুই সমুদ্রের মিলনস্থল:
مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيَانِ
بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِيَانِ
“তিনি দু’টি সমুদ্রকে প্রবাহিত করেছেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক আড়াল, যা তারা অতিক্রম করে না।” (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)
আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, বিভিন্ন সমুদ্রের পানি মিলিত হলেও তাদের লবণাক্ততা, ঘনত্ব ও তাপমাত্রায় পার্থক্য থাকে এবং একটি অদৃশ্য প্রাচীর তাদের আলাদা রাখে।
যৌক্তিক বিশ্লেষণ ও চ্যালেঞ্জ
কুরআনের অলৌকিকতাকে যারা অস্বীকার করতে চান, তাদের জন্য এর উৎস সম্পর্কে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন থেকে যায়:
* নিরক্ষর ব্যক্তির জ্ঞান: রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন নিরক্ষর। তার পক্ষে তৎকালীন প্রচলিত কোনো জ্ঞান ছাড়াই মহাবিশ্ব, ভ্রূণবিদ্যা বা সমুদ্র সম্পর্কে এত নির্ভুল তথ্য দেওয়া কীভাবে সম্ভব হলো? এর একমাত্র যুক্তিযুক্ত উত্তর হলো, এই জ্ঞান কোনো মানবীয় উৎস থেকে আসেনি।
* ভবিষ্যৎবাণী: কুরআনে এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে যা পরবর্তীকালে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। যেমন, রোমান ও পারস্যদের যুদ্ধের ফলাফল (সূরা রুম)।
* বৈপরীত্যের অনুপস্থিতি: একটি গ্রন্থ যদি দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে খণ্ড খণ্ডভাবে অবতীর্ণ হয় এবং তা মানব রচিত হয়, তাহলে তাতে অসংখ্য বৈপরীত্য বা অসঙ্গতি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কুরআন সম্পূর্ণ বৈপরীত্যমুক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
“তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? যদি তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে আসতো, তবে তারা তাতে অনেক অসঙ্গতি পেত।” (সূরা নিসা: ৮২)
উপসংহারঃ
কুরআন হলো এমন এক জীবন্ত মোজেজা (অলৌকিকতা) যা কেবল ভাষাগত বা সাহিত্যিক সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং যৌক্তিক সঙ্গতিও এর ঐশ্বরিকতার অকাট্য প্রমাণ। আধুনিক বিজ্ঞান যত উন্নতি করছে, কুরআনের সত্যতা ততই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানুষের তৈরি গ্রন্থ নয়, বরং এটি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ চূড়ান্ত পথনির্দেশিকা। এর প্রতিটি আয়াত মানুষকে চিন্তা করতে, গবেষণা করতে এবং স্রষ্টার অস্তিত্ব ও মহিমা উপলব্ধি করতে উৎসাহিত করে।
মন্তব্য করুন